কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত টেকনাফ উপজেলার হ্নীলার মুক্তিযুদ্ধের অন‍্যতম সংগঠক মরহুম আলহাজ্ব মঈন উদ্দিন আহমেদ প্রকাশ মঈন উদ্দিন মেম্বার একজন সজ্জ্বন, প্রথিতযশা শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক হিসেবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে সমাদৃত ছিলেন।

হ্নীলা উচ্চ বিদ‍্যালয়, হ্নীলা প্রাথমিক বিদ‍্যালয়সহ এলাকার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও বিকাশে আজীবন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। রঙ্গীখালী ইসলামিক সেন্টারে ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে প্রতিষ্ঠান গুলোর সার্বিক উন্নয়নে মৃত‍্যূর আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ঐতিহ্যবাহী ফুলের ডেইল জামে মসজিদ পরিচালনা, হেফজখানা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নসহ সামাজিক বিচার -সালিশ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আমৃত্যু সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। ব‍্যাক্তিজীবনে তিনি উদার ও অসাম্প্রদায়িক মনের একজন সফল মানুষ ছিলেন। ৮১ বছর বয়সে ছয় ছেলে ও দুই মেয়, আত্মীয় – স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে তিনি পরলোকে পাড়ি জমান।

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা :

মরহুম আলহাজ্ব মঈন উদ্দিন আহমেদ ১৯২৯ সালে টেকনাফ উপজেলার অন্তর্গত হ্নীলা ফুলের ডেইল গ্রামে এক সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা খলিলুর রহমান ও মাতা নবীন সোনার ছয় ছেলে এবং ছয় মেয়ের মধ‍্যে তিনি তৃতীয়।

শৈশব থেকে পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ থাকার কারণে পরিবারের আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও পিতা -মাতা তাকে বিদ‍্যালয়ে ভর্তি করে দেন। হ্নীলা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ঈদগায় নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। উখিয়ার রাজাপালং উচ্চ বিদ‍্যালয়ে নবম শ্রেণিতে অধ‍্যায়ন রত অবস্থায় তিনি পিতৃ হারা হন। কঠিন বাস্তবতার মধ‍্য দিয়ে নিজের প্রচেষ্টায় তিনি ১৯৫৪ সালে উখিয়ার রাজাপালং উচ্চ বিদ‍্যালয় থেকে কৃতিত্ত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাশ করেন। অনেক প্রত‍্যাশা নিয়ে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে কলেজ জীবন তাঁর দীর্ঘায়িত হয়নি। ভাগ‍্যের নির্মম পরিহাসে বাধ্য হয়ে তাকেঁ শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে হয়।

কর্ম ও বৈবাহিক জীবন :

বড় সংসারের দায়িত্ব নিয়ে প্রবেশ করতে হয় কর্মজীবনে। ১৯৫৬ সালে মিরশরাই থানায় সেটেলম‍্যান অফিসার হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর তিনি আমিন জুট মিলের ক্রয় কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ত‍্যাগ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসাবে স্বাধীন পেশা বেছে নেন। এ সুবাদে টেকনাফ -কক্সবাজার মহাসড়ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন। ১৯৫৯ সালে তিনি টেকনাফে বাহারছড়ার জমিদার ও সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম রশিদ আহমেদ চৌধুরীর মেয়ে হাফেজা খাতুনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৫১ বছরের সুখী দাম্পত্য জীবনে তিনি ছয় পুত্র ও দুই কন‍্যা সন্তান – সন্ততীর জনক। একজন সফল পিতা হিসেবে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁর পুরো পরিবারকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন।

রাজনৈতিক জীবন :

ছাত্রজীবন থেকে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৫৪ সালে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রামের কর্মজীবন ছেড়ে হ্নীলায় চলে আসেন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর সমৃদ্ধ রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে হ্নীলা ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলনের মধ‍্য দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতির নেতৃত্বে চলে আসেন। হ্নীলা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯ এর গণঅভ‍্যূত্থান এবং ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ নির্বাচনে কক্সবাজার আসন থেকে তাঁর ভায়রা এডভোকেট নুর আহমদ এম,এন,এ নির্বাচিত হন। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযোদ্ধের একজন অন‍্যতম সংগঠক হিসেবে স্থানীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ভূদ্ধ করেন। তাঁর ইচ্ছায় আপন ছোট ভাই মরহুম আইয়ুব আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

তার ফলশ্রুতিতে চিহ্নিত আওয়ামী পরিবার হিসেবে পাক হানাদার বাহিনীর নানা আক্রমণ ও নির্যাতনের শিকার হন। জ্বালিয়ে দেয় তাঁর নিজ ও শ্বশুরবাড়ি। এসময় নিগৃহীত হয়ে আত্মীয় – স্বজনসহ স্ব-পরিবারে শরনার্থী হিসেবে বার্মায় আশ্রয় নেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একজন প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৫ পরবর্তী স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতির পুনর্গঠন, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন এবং স্থানীয়- জাতীয় পর্যায়ের প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থীর বিজয়ে অন‍ন‍্য ভূমিকা রাখেন। সৎ ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতিতে অবিচল থেকেছেন।

লেখক, মঈন উদ্দিন মেমোরিয়াল বোর্ডের ট্রাষ্টি ও শিক্ষক