বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ঠেকাতে গত ১৬ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। করোনা পরিস্থিতি অবনতির কারণে এ ছুটি আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সর্বশেষ এ ছুটি আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপরো চলতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। সামনে শীত মৌসুম থাকায় এ আশঙ্কা আরো ডালপালা মেলছে। কারণ সবাই আশঙ্কা করছেন, শীতকালে করোনার সংক্রমণ বাড়বে। যদিও দীর্ঘ ছুটিতে সিলেবাস এগিয়ে নিতে টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে পাঠদান সম্প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। যদিও শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশই দূরশিক্ষণ পদ্ধতির এ পাঠদান থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

জানা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশ করোনার মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেও আবারো বন্ধ করতে বাধ্য হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ছয় মাসে দুই লাখ ৭৭ হাজার ২৮৫ জন স্কুল শিক্ষার্থী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সেদেশের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে।

এ অবস্থায় চলতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাও খোলা হতে পারে, এমন আভাস দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নভেম্বর মাসে স্কুল খুললেও মাত্র ৩০ দিন সময় থাকবে। টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইনে পাঠদানও তেমন ফলপ্রসু হয়নি। সবমিলিয়ে চলতি বছর শিক্ষায় বড় ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। সেজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত খোলার ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকার উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করলেও তা থেকে সরে এসেছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রুমগুলোতে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। রয়েছে গণরুম সমস্যাও। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সংক্রমণ বাড়তে পারে। এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে রাজি নয় সরকার।

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেন, চলতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে কিনা, সব কিছুই নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির উপর। স্কুল খোলার পর আবার বন্ধ করার চেয়ে পরিস্থিতি দেখে একবারে খোলা উত্তম। নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ছুটিতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রথম ধাপ হলো শ্রেণীকক্ষে অনুপস্থিতি। আর ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ দরিদ্রতা। করোনার ছুটিতে একদিকে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকছে, অন্যদিকে কর্মের সুযোগ না থাকায় আয় বন্ধ হয়েছে হাজারো পরিবারের। তাই করোনার এ দীর্ঘ ছুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

করোনায় দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)। সম্প্রতি এক পলিসি ব্রিফের মাধ্যমে সংস্থাটি জানিয়েছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৩ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে মেয়ে ২ কোটি ২১ লাখ ৫ হাজার ৫৮৯ এবং ছেলে ১ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার ২৫৪ জন। যার মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫ হাজার ৮২৫ জন, প্রাথমিকে ৮৭ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩ জন, মাধ্যমিকে ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৬ জন এবং ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮৫ জন উচ্চশিক্ষায়। এছাড়া ২ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।