নীতিমালা প্রণয়ন হলে লবণের দাম নিয়ে দীর্ঘদিন চলে আসা সংকট কেটে যাবে। নিশ্চিত হবে চাষীদের ন্যায্যমূল্য। এরজন্য এ মাসেই ঢাকায় চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণী বৈঠক করা হবে বলে জানিয়েছেন শিল্প সচিব কে এম আলী আজম। বৈঠকে লবণবোর্ড করার প্রস্তাবটি নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘লবনশিল্প সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সাথে মতবিনিময়’ সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান শিল্প সচিব।

শিল্প সচিব বলেন, ‘বৈঠকে চাষী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে মতামত দিয়েছেন। তাদের সমস্যা এবং সমাধানের উপায় সম্পর্কে জেনেছি। কোন নীতি নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তরসহ অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকে। ঢাকায় নীতি নির্ধারণী বৈঠক করে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এমনভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে যাতে চাষী, ভোক্তা, মিল মালিক, ব্যবসায়ী সহ অন্যান্য যারা সংশ্লিষ্ট আছে সকলে সহনশীল অবস্থায় থাকতে পারে। একইসাথে বিষয়টি যেন চাষীদের জন্য লাভজনক হয় এবং ঐতিহ্যবাহী এই পেশা যেন টিকে থাকে। নীতি নির্ধারণী বৈঠকটি চলতি মাসেই করার প্ল্যান আছে। আশা করছি, শিগগিরই নীতিমালা প্রণয়ন হবে।

তিনি আরও বলেন, লবণ বোর্ড গঠনের প্রস্তাবটি দীর্ঘদিনের। আজকের বৈঠকেও দাবিটি উঠেছে। নীতি নির্ধারণী বৈঠকে লবণ বোর্ড নিয়েও ফাইনাল সিদ্ধান্ত হবে। সভা থেকে বের হয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) অ্যাড. ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলেছেন। তিনি আমাদেরকে পৌনে একঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি (শেখ হাসিনা) লবণ চাষীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাদেরকে মাঠে নামতে বলো আমি শেখ হাসিনা বেঁচে থাকলে লবণ চাষীরাও বাঁচবে।’ প্রধানমন্ত্রী লবণচাষীদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। কিন্তু কিছু সংখ্যক ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে আমরা লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিল্প সচিব কক্সবাজারে এসেছেন। আমরা আশা করছি লবণের দাম নিয়ে চলে আসা সমস্যা কেটে যাবে। লবণচাষীরা লাভবান হবেন।

কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, আমরা আজকে সকলে মিলে শিল্প সচিবকে লবণচাষীদের দুর্দশার কথা বলেছি। আমরা শিল্প সচিবকে বলেছি যা কিছু সিদ্ধান্ত আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নিতে হবে। যাতে চাষীরা মাঠে নামে। আশা করছি এই বিষয়ে খুব শিগগিরই একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাবো।

হেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কুতুবদিয়া থেকে ফোনে কথা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানার পর বলেছিলেন লবণ আমদানী নয়, লবন রপ্তানী করা হবে। তারই আলোকে শিল্প সচিব আজকে লবণচাষীদের দুর্ভোগের কথা সরাসরি শোনার জন্য এসেছেন। বৈঠকে শিল্প সচিবকে আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরণের তথ্য দিয়েছি। বিশেষ করে আমরা চাই, শিগগিরই লবণ চাষীরা তাদের লবণের উৎপাদন খরচ পুষিয়ে যাতে কিছু লাভ করতে পারে সেভাবে যেন দাম নির্ধারণ করা হয়। সেই দাম নির্ধারণ বা দাম না পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে বিশেষ করে, বন্ডের মাধ্যমে বেক টু বেক এলসির নামে অবৈধভাবে লবণ আসা, সোডিয়াম সালফেটের নামে ক্লোরাইট নিয়ে আসা এসব কাজ বন্ধ করার জন্য যাতে সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং লবণচাষীদের লবণ বোর্ড প্রতিষ্ঠাসহ সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি চাষীদের লবণ মাঠে নেমে পড়ার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিক। আপনারা লবণের ন্যায্যমূল্য পাবেন।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় এতে বক্তব্য দেন সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. মোশতাক হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, কক্সবাজার শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী।

বিসিক কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় লবণমিল মালিকদের পক্ষে বক্তব্য দেন- মহেশখালী পৌর মেয়র মকছুদ মিয়া, বাংলাদেশ লবণমিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির, বাংলাদেশ লবণচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল, ইসলামপুর লবণমিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ, বাংলাদেশ লবণমিল মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি নুরুল আবছার হেলালী, মিলার ফরিদুল ইসলাম খান, কাজি আবুল মাসুদ, শরীফ বাদশা, আবদুল গফুর প্রমুখ।

অসাধু ব্যবসায়ীরা শিল্প লবণের আড়ালে দেদারছে সোডিয়াম সালফেট বাজারজাত করছে। যে কারণে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দেশীয় শিল্প বিরোধী চক্রের হাতে ধ্বংস হচ্ছে লবণখাত।
দেশের বিরাট একটি শিল্পকে বাঁচাতে লবণসাদৃশ্য বস্তু সম্পূর্ণ বন্ধ অথবা চেপ্টার ২৮, ২৯ এর আওতায় যে সমস্ত লবণসাদৃশ্য বস্তু আমদানি করা হয় সে সব বস্তু সিডি (কাস্টম ডিউটি) ৩০ শতাংশ এবং এসডি (সাপ্লিমেন্টারী ডিউটি) ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ লবণমিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির।

সভায় লবণের জাতীয় চাহিদা নির্ণয়, চাষিদের অর্থঋণ প্রদান, লবণের বাজারমূল্য নির্ধারণ, কম দামে পলিথিন সরবরাহ, মনিটরিং সেল এবং লবণবোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছে লবণমিল মালিক ও চাষিরা।