স্বল্পমূল্যে বিভিন্ন মাপের প্লট দেয়ার কথা বলে প্লটপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে নেয়া হতো। খাস ও দখল করা জমি শুধু নয়, পানির নিচের জমিও স্বল্পমূল্যে বিক্রির জন্য সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। রেজিস্ট্রেশন করে দেয়ার কথা বলে প্রত্যেক প্লটপ্রত্যাশীর কাছ থেকে নিয়েছেন ১২ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত। সব মিলিয়ে ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন নাসিম রিয়েল এস্টেটের মালিক ইমাম হোসেন নাসিম (৬৬)। শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি।

বুধবার রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তার অপকর্মের সহযোগী তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমাসহ (৩২) নাসিমকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৪ এর একটি দল।

এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ৭.৬৫ মিমি বিদেশী পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, তিন রাউন্ড গুলি, এক লাখ ৩৫ হাজার জাল টাকা, এক হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা, দুই বোতল বিদেশী মদ, চারটি ওয়াকিটকি সেট, ছয়টি পাসপোর্ট, ৩৭টি ব্যাংক চেক এবং ৩২টি সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে র্যাব।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন র্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মো: মোজাম্মেল হক।

তিনি জানান, নানা অভিযোগে দায়ের করা ৫৫টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি ছিলেন নাসিম। গ্রেফতার এড়াতে আন্ডারগ্রাউন্ডে গোপন সুড়ঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংবলিত দরজাযুক্ত অফিসে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, প্রতারক নাসিমের গ্রামের বাড়ি ভোলায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তার বাবা বেলায়েত হোসেন গ্রাম্যডাক্তার ছিলেন। পরে তাকে নিয়ে তার বাবা রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় চলে আসেন। এরপর নাসিম মিরপুর এলাকায় পড়ালেখা করেন। তিনি নিজেকে গ্র্যাজুয়েট দাবি করেন।

নাসিম ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠিকাদারির কাজ করে এলেও ২০০২ সাল থেকে অভিনব প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে কথিত নাসিম রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিতে থাকেন। এই পরিচয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে, ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শনপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় অন্যের জমি, খাসজমি দখল করে আবাসিক শহর গড়ে দেয়ার নামে প্রায় পাঁচ হাজার সাধারণ মানুষের সাথে বায়না করে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং ২৫০ জনের সাথে ভুয়া চুক্তিপত্র করে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে ১২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

এভাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এর পাশাপাশি নাসিম ২০০৫ সাল থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করতে থাকেন।

ডিআইজি মো: মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন সময় নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করে তিনি প্রতারণা করতেন এবং কাজ সেরে প্রতারণার শিকার মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতেন। কখনো কখনো অস্ত্র প্রদর্শন ও ওয়াকিটকি দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতেন নাসিম।

দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে স্ত্রীর সহযোগিতায় ইয়াবা ও বিদেশী মদ সংগ্রহ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ডিলার ও খুচরা মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করতেন তিনি। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জাল নোটের ব্যবসা পরিচালনা করতেন এ দম্পতি।

গ্রেফতার এড়াতে আন্ডারগ্রাউন্ডে গোপন সুড়ঙ্গে অবস্থিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংবলিত দরজাযুক্ত অফিসে পালিয়ে থাকতেন নাসিম। তার অনুপস্থিতিতে তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমা প্রতারণার কর্মকাণ্ড দেখাশোনা করতেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, নাসিম প্রতারণা, ভূমিদস্যুতা, মাদক ও জাল টাকার কারবারসহ বিভিন্ন অভিযোগের ৫৫টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি।

তিনি বলেন, গ্রেফতার নাসিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদকসহ প্রতারণার চারটি মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রতারিত ভুক্তভোগীরা র্যাবের সাথে যোগাযোগ করছেন। যারা মামলা করতে ইচ্ছুক, র্যাব-৪ তাদের প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।