আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আল ইয়াকিন নেতা মাস্টার আবুল কালাম নিখোঁজের পর থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। আরসা’র দাবি মাস্টার মুন্নার অনুসারিরা কালামকে অপহরণ করেছে। মুন্নার দাবি আরসা নেতা কালাম নিখোঁজের পেছনে তার কোন হাত নেই।

গত ২৬ আগস্ট থেকে মাস্টার কালাম নিখোঁজ রয়েছেন। এরপর থেকে দুই মাস্টারের অনুসারিদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ লেগেই আছে। সর্বশেষ মুন্নার দুই ভাই মাহমুদুল্লাহ ও ফরিদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় গত ৭ অক্টোবর। একই দিনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে টেকনাফের পশ্চিম হ্নীলার নুর হোসেনের ছেলে নুরুল হুদা। নিখোঁজ রয়েছেন মুন্নার বাবা দ্বীন মোহাম্মদ ও একভাই ওমর ফারুক।

আরসা নেতা কালাম : মাস্টার কালাম মিয়ানমার আকিয়াব জেলার মংডু থানার নেসার আহমদের ছেলে। বর্তমানে কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্পের ১ নং ব্লকে থাকেন। ২০১৬ সালের ১৩ মে ভোররাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মোচনী এলাকায় নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালায় একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। তারা আনসার ক্যাম্পের কমান্ডার মোহাম্মদ আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে ১১টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬৭০টি গুলি লুট করে।

দেশজুড়ে আলোচিত চাঞ্চল্যকর অস্ত্রলুটের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী খাইরুল আমিন ও মাস্টার আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ -মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু এলাকার জঙ্গল থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়। প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর গত ২৫ জুলাই বান্দরবান কারাগার থেকে জামিনে বের হন কালাম।

জানা যায়, ইয়াবা চালানের ভাগ ভাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে কালামকে অপহরণ করা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট কুতুপালং আমতলী এলাকা দিয়ে বড় ধরনের ইয়াবার চালান নিয়ে আসছিলো রোহিঙ্গা শরণার্থী মাস্টার মুন্নার গ্রুপ। মাস্টার মুন্না এক সময় শিক্ষকতা করলেও বাংলাদেশে আসার পর ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাফেরা করা ইয়াবা ডন মুন্না কুতুপালং আনরেজিস্টার্ড ক্যাম্প এলাকার মার্কাস পাহাড় এলাকায় অবস্থান করেন। মূলত মাস্টার কালামের নিখোঁজের পর থেকে কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বিবাদমান দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর পরই কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। ডিআইজি বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার থাকার প্রশ্নই উঠে না। এখানে আধিপত্য থাকবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যৌথ টহল চলছে।

কিছু কিছু এলাকায় ব্লক রেইড চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা নেয়া হবে। ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলছে। কোন অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবে না।

তবে মুন্নার দাবি, মাস্টার কালাম নিখোঁজের পেছনে তার কোন হাত নেই। গত ৭ সেপ্টেম্বর দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যার পর একটি অডিও বার্তায় এ দাবি করেন মুন্না। অডিও বার্তার একটি কপি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তাতে মুন্না বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদকে আরসা গ্রুপ ধরে নিয়ে গেছে। আমি কিছুই জানি না। আমি থাকি আনরেজিস্টার্ড ক্যাম্পে। আর কালাম থাকেন রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে। ওরা নিজেরা মারামারি করছে। কালামের নিখোঁজের ব্যাপারে আমাকে দায়ী করছে। আরসা’র লোকজন আমার আত্মীয় স্বজনকে মারছে। আমার দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি কারো কোন ক্ষতি করিনি।

তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে আরসা মারামারি করছে। কোন ঘটনার জন্য আমি দায়ী থাকলে আমাকে মারেন। মুন্না তার অডিও বার্তায় বলেন, যারা আমার দুই ভাইকে হত্যা করেছে, এক ভাই ও বাবাকে অপহরণ করেছে তাদের ক্ষমা করবো না’।

মাস্টার মুন্না : ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন কারো কাছে রফিক কারো কাছে ইয়াবা মুন্না আবার কাছে আবদুল আজিজ হিসাবে পরিচিত মাস্টার মুন্না। তিন ভাই মাহামুদুল্লাহ ওরফে গিয়াশ্রী, ফরিদ ও ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন মাহামুদুল্লাহ ও ফরিদ। নিখোঁজ রয়েছেন আরেক ভাই ওমর ফারুক ও বাবা দ্বীন মোহাম্মদ। ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে আসা যাওয়া রয়েছে মুন্নার। মিয়ানামারের উত্তর নাগপুরার বাসিন্দা মুন্না ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাস্তুচ্যুত হয়ে স্থায়ীভাবে চলে আসেন বাংলাদেশে। মরকজ পাহাড় ক্যাম্প-২ এর ডি ব্লকে থাকেন। বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন মুন্না।