চকরিয়ায় প্রয়াত বাবার ধর্মীয় আচার শেষে ফেরার মুহূর্তে সাত ভাই-বোনকে চাপা দেওয়া ঘাতক পিকআপ চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক এএসপি ইমরান খান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে নিহতদের ভাই প্লাবন চন্দ্র শীল বাদী হয়ে অজ্ঞাত পিকআপ চালককে আসামি করে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর ১০৫/৯৮/৯৫ ধারায় চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-১৫/২০২২ ইংরেজি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত পিকআপের চালক সাইফুল নিহতদেরকে গাড়ি চাপা দেওয়ার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করে। গ্রেফতারকৃতের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয় ঘাতক পিকআপটির চাবি।

গ্রেফতারকৃত সাইফুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোর আনুমানিক ৫ ঘটিকায় তারেক ও রবিউল নামক দুইজনসহ চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে সবজি বোঝাই পিকআপ নিয়ে সে রওনা করে। রাস্তায় অধিক কুয়াশা থাকা সত্ত্বেও চালক সাইফুল দ্রুত কক্সবাজার পৌঁছে সবজি ডেলিভারি দেয়ার জন্য বেপরোয়া গতিতে পিকআপটি চালাচ্ছিল। অধিক কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে মালুমঘাট বাজারের নার্সারি গেটের সামনে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষারতদেরকে চালক সাইফুল দূর থেকে লক্ষ্য করতে পারেনি। গাড়ীর অধিক গতি থাকার কারণে কাছাকাছি এসে লক্ষ্য করলেও গাড়িটি সে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দূর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়। দূর্ঘটনার সময় তার সাথে পিকআপ মালিকের ছেলে তারেক ও ভাগিনা রবিউল ছিল। সে আরও জানায়, দূর্ঘটনার সময় গাড়িটি প্রায় ৬৫-৭০ কিঃ মিঃ/ঘন্টা গতিতে চলছিল এবং চালক গাড়ি থামানোর জন্য ব্রেক করলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি প্রায় ১০০ ফুটের মতো সামনে চলে যায়। পরবর্তীতে চালক পিকআপ থেকে নেমে নিহতদের দেখতে আসলেও মালিকের ছেলে তারেকের নির্দেশে সে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করে।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে র‍্যাব আরো জানায়, গ্রেফতারকৃত পিকআপ চালক সাইফুল এর কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও দীর্ঘ ২ বছর যাবত সে পিকআপ, চাঁন্দের গাড়ী এবং ৩ টন ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরণের গাড়ি চালানোর কাজে নিয়োজিত ছিল। দূর্ঘটনার ১ সপ্তাহ পূর্বে সে উক্ত পিকআপটি মালিকের নিকট থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি ভিত্তিতে চালানো শুরু করে। ইতোপূর্বে সে বান্দরবানের লামাতে একটি রাবার বাগানে চাকুরী করত বলে জানা যায়।

দূর্ঘটনার পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত সাইফুল মালুমঘাট বাজারের একটি স্থানে গাড়িটি থামিয়ে মালিককে ফোন করে দূর্ঘটনার বিষয়টি জানায়। গাড়িটির মালিক তাকে পিকআপটি পরবর্তী কোন এক স্টপেজে রেখে লোকাল বাসে করে তার সাথে দেখা করতে বলে। মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত সাইফুল ডুলাহাজরায় এসে পিকআপটি রাখে এবং লোকাল বাসে করে চকরিয়া গিয়ে মালিকের সাথে দেখা করে। পিকআপের মালিক মাহমুদুল তাকে নূন্যতম ১ বছর আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দিলে সে প্রথমে তার পূর্ববর্তী চাকুরীস্থল বান্দরবানের লামার রাবার বাগানে আত্মগোপনে যায়। পরে তা জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে অন্যত্র আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে ঢাকায় চলে আসে এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকা হতে র‌্যাব কর্তৃক শুক্রবার গ্রেফতার হয়।

পিকআপের মালিক মাহামুদুল করিম, পিতাঃ শামছুল আলম, চকরিয়া, কক্সবাজার। মূলত তিনি সবজি পরিবহণের ব্যবসা করেন। তিনি চকরিয়ার সবজির আড়ৎ থেকে কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী এলাকায় সবজি সরবরাহ করত। তার ছেলে তারেক সবজি সরবরাহের তদারকি করত এবং ভাগিনা রবিউল তারেকের সহযোগী হিসেবে কাজ করত। মাহমুদুল করিম ২০১৬ সালে উক্ত পিকআপটি ক্রয় করেন। মূলত সবজি পরিবহণের উদ্দেশ্যেই পিকআপটি ব্যবহার করা হতো। গত ৪ বছর ধরে উক্ত পিকআপের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন এবং গত ৩ বছর ধরে রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। দূর্ঘটনা পরবর্তীতে পিকআপের মালিক, তার ছেলে তারেক ও ভাগিনা রবিউল আত্মগোপনে রয়েছে বলে র‍্যাব প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট নামক স্থানে উক্ত পিকআপের চাপায় একই পরিবারের ০৪ সহোদর ভাই যথাক্রমে অনুপম শীল (৪৬), নিরুপম শীল (৪০), দীপক শীল (৩৫) চম্পক শীল (৩০) ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন অপর সহোদর ভাই স্বরণ শীল (২৪)। উক্ত দূর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হয় তাদের সহোদর ভাই রক্তিম সুশীল এবং বোন হীরা সুশীল। বর্তমানে রক্তিম সুশীল চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন।

গত ৩০ জানুয়ারি নিহতদের পিতা সুরেশ চন্দ্র সুশীল বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। গত ০৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূজা শেষ করে তারা ৯ ভাই-বোন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মালুমঘাট বাজারের নিকট রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষারত ছিলেন। এ সময় ভোর ৫ টার দিকে কক্সবাজারমুখী বেপরোয়া গতিতে চলমান এ পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মূলসড়ক থেকে নেমে গিয়ে তাদের চাপা দেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করে। উক্ত ঘটনায় নিহতদের ভাই প্লাবন সুশীল (২২) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পিকআপ চালককে আসামী করে কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় সড়ক পরিবহন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।