কক্সবাজারের টেকনাফে থাকা রোহিঙ্গাদের দুই ক্যাম্প নিয়ে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা। ২১ ও ২২ নম্বর এ ক্যাম্প দুটো যথাক্রমে চাকমারকুল এবং উনচিপ্রাং নামে পরিচিত। দুই ক্যাম্পে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। ক্যাম্প দুটি একদিকে যেমন পরিবেশগত দিক থেকে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ক্যাম্প দুটি নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

</divইতোমধ্যেই ক্যাম্প দুটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল এবং ডাকাত দলের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্প দুটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে গত সপ্তাহে পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্প দুটি বন বিভাগের ২২০ একর জমিতে অবস্থিত। দুই ক্যাম্পে বিভিন্ন ব্লকে পাহাড়ের ঢালে তৈরি বসতঘরে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে। সেখানে ৭৫ থেকে ৯০ ডিগ্রি কোণে পাহাড় কাটা হয়েছে এবং গভীর নলকূপ, পাম্প ও টিউবওয়েলের মাধ্যমে প্রতিদিন ৭ লাখ ৪৪ হাজার লিটার পানি ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে।

ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস ও জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় জীবনহানি হয়েছে। 

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ২১ সম্পর্কে বলা হয়, ৯৯ দশমিক ৮৬ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পটির পুরোটাই পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। এই ক্যাম্পে ৩ হাজার ৬০০ পরিবারের প্রায় ১৬ হাজার  রোহিঙ্গার বাস।

এই ক্যাম্পের ২২টি উপ ব্লকের মধ্যে ৮ উপ ব্লক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ৮ উপ ব্লকের ১২৩৫টি পরিবারের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার পরিবার সরাসরি জীবনঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ বিপজ্জনকভাবে পাহার কেটে সেই ঢালে ঘরগুলো বানিয়ে তারা বসবাস করছে। আগামী বর্ষার মৌসুমে এসব পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এখানে নেই কোনো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হবে না। উপরন্তু এই ক্যাম্পে প্রতিদিন ৩ লাখ ৩০ লিটার পানি তোলা হয় গভীর নলকূপের মাধ্যমে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের কোনো এসটিপি না থাকায় চরমভাবে পরিবেশ দূষণের কথাও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

২২ নম্বর ক্যাম্প সম্পর্কে পরিবেশ অধিদফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১২.৫৬ একরের এই ক্যাম্পে ৩৩৩৯টি পরিবারের ২২ হাজার ২০০ রোহিঙ্গার বসবাস। এখানকার ঘরগুলো ৭৫ থেকে ৯০ ডিগ্রি কোণে কাটা হয়েছে। নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে অতিবৃষ্টি ফলে পাহাড়ধস অবশ্যম্ভাবী। পাশাপাশি এই ক্যাম্পে প্রতিদিন তোলা হচ্ছে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ভূগর্ভস্থ পানি। তাই এখানকার ৩২ পরিবারের ৪-৫০০ রোহিঙ্গাকে আশু স্থানান্তর করা প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে বলা হয়েছে, ক্যাম্প ২১ ও ২২ এ মোট ১২৬২টি পরিবারের ৬ হাজার রোহিঙ্গাকে এখনই পাহাড়ের ঢাল থেকে সরানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌল অধিদফতর ও উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর ক্ষতির বিষয়ে বনবিভাগের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

জানতে চাইলে রোঙ্গিাদের দেখভালের মূল দায়িত্বে থাকা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামছুদ্দৌজা গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এই দুই ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পাহাড়ের উপরের ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত আমাদের আগে থেকেই আছে। এখন পরিদর্শন প্রতিবেদন পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। অন্যদিকে, এই দুই ক্যাম্প নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ২১ ও ২২ নম্বর ক্যাম্প দুটি সমতল থেকে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগে ক্যাম্প দুটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল এবং ডাকাত দলের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক পাচারসহ নানা ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এখানে গা ঢাকা নিয়ে থাকছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের হত্যা, ঘরবাড়িতে হামলাসহ নানা অপরাধমূলক কাজ করে এখানে আশ্রয় নিচ্ছে ডাকাত ও সন্ত্রাসীরা।