সাতাত্তর বছর বয়সের মানুষটি টানা একান্ন বছর পার করে দিয়েছেন মুজিব কোট গায়ে দিয়ে। কি গরম আর কি ঠান্ডা বছরের বারটি মাসই তার কাছে এক রকম। মুজিব কোট গায়ে থাকবেই। মুজিব কোট ছাড়া ঘরের বাইরে যান না তিনি। এমনকি মুজিব কোট বিহীন অবস্থায় তার দেখা মেলাও ভার। খুব কম মানুষেই তাকে দেখেছে মুজিব কোট ছাড়া। এমনকি ঈদ-কোরবানের পোশাকের সাথেও থাকে সেটি। এই মানুষটির নাম আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও সাংবাদিক- এই লোকটি আপাদমস্তক একজন প্রকৃত বঙ্গবন্ধু ভক্ত। রাজনীতিতে ‘আওয়ামী লীগার’ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজার জেলার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘দৈনিক কক্সবাজার’ এর সম্পাদক ও প্রকাশক।

যে মুজিব কোট ১৯৬৪ সালে তার গায়ে চড়েছিল সেটি গত ৫১ বছরেই আর ছাড়া হয়নি (২০১৫ সাল পর্যন্ত)। মুজিব কোটের কাহিনী বলতে গিয়ে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন- ১৯৬২ সালে তার সভাপতিত্বে কক্সবাজারের আদালত মাঠে ন্যাশন্যাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) একটি সভা হয়। সেই সভায় সোহরাওয়ার্দ্দী, শেখ মুজিবুর রহমান ও চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদ নবী চৌধুরী এসেছিলেন। সভা শেষে রাতে কক্সবাজার সী বীচ রেষ্ট হাউজে শেখ সাহেবের (বঙ্গবন্ধু) সাথে একান্তে রাজনৈতিক আলাপ হয় মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের। সেই আলাপেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এনডিএফ দিয়ে হবে না- আওয়ামী লীগ গঠন করতে হবে। একথা বলেই বঙ্গবন্ধু তার হাতে হাত রেখে কথা পাকাপাকি করেন।

তারপর ১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধু কক্সবাজার আসলেন। সেই ১৯৬৪ সালে প্রথম একটি মুজিব কোট তিনি সেলাই করেছিলেন। তাও বঙ্গবন্ধুর কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে। এখনো মনে আছে তার সেই ডিসেন্ট টেইলার্সের কথা। কক্সবাজার শহরের পাবলিক লাইব্রেরীর উত্তর পার্শ্বে প্রধান সড়কেই ছিল মরহুম মোহাম্মদ আলীর টেইলারিং দোকানটি। সেই ডিসেন্ট টেইলার্স কালের সাক্ষী হয়ে এখনো আছে। তখনকার দিনে ডিসেন্ট টেইলার্সই এ শহরের একমাত্র বনেদি লোকের কাপড় সেলাইর নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্টান ছিল। মুজিব কোট গায়ে দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে মঞ্চে উঠলেন তখন বঙ্গবন্ধু নাকি মুচকি হেসে বলেছিলেন-‘সত্যিইতো তোকে বেশ মানিয়েছে, সব সময় পড়বি কিন্তু…।’ এই মঞ্চেই কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। তিনি মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগটনিক সম্পাদক হন। তার সেই মুজিব কোট সেই থেকে আর ছাড়া হয়নি।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজার জেলা শহরের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র দৈনিক কক্সবাজার এর সম্পাদক ও প্রকাশক হলেও তিনি আওয়ামী লীগার হিসাবেই সবচেয়ে বেশী পরিচিত। কেননা তিনি আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালেও এক মুহুর্তের জন্যও মুজিব কোট খুলেননি। মুজিব কোটের সাথে আপোষও করেন নি কোন দিন। মুজিব কোট নিয়ে বিব্রত বোধ করেননি কোন সময়। বরং রিতীমত গর্ব করেন তিনি। তিনি বলেন-‘ মুজিব কোট নিয়ে আমি দেশের একজন রাষ্ট্রপতি এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়ে বার বার বাঁধার সন্মুখিন হয়েছিলাম। তবুও আমি মুজিব কোট খুলিনি। এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের ভয়াল দিনেও ঢাকার রাজপথে আমি মুজিব কোট গায়ে দিয়ে চলাচল করেছি।’

এসব ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন-‘ আমি কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্সবাজার সফরে এসে সার্কিট হাউজে প্রেস ক্লাব সভাপতি হিসাবে আমারও ডাক পড়েছিল। আমি গেলাম যথারিতী। কিন্তু সেখানে বিধি বাম। আমার গায়ে মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতির কয়েকজন সফর সঙ্গীও এক প্রকার হতবাক। তাদের অনেকেই এসময় বলাবলিও করছিলেন-লোকটার কেমন সাহস ?’ তিনি বলেন- আমার গায়ে মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষীরা সার্কিট হাউজের ফটকেই থামিয়ে দেন। তারা আমাকে বললেন, গায়ের মুজিব কোট খুলে যেন রাষ্ট্রপতির সাথে বসি। তাতেও আমি রাজি হলাম না। অগত্যা মুজিব কোট গায়ে আমাকে ঢুকার অনুমতি দেয়া হল।

পুরো অনুষ্ঠানে ছিলেন কেবল তিনি একাই মুজিব কোট গায়ে। ফলে সবারই দৃষ্টি ছিল তার উপর। মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতিও বার কয়েক তাকালেন তার দিকে। এক সময় মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন-‘ আসুন আমার সাথে দল করি। জবাবে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন, আমার গায়ে মুজিব কোট-আমি দল করি বঙ্গবন্ধু মুজিবের। প্রতিউত্তরে রাষ্ট্রপতি জিয়াও নাকি বলেছিলেন-আমরাওতো বঙ্গবন্ধুর… কিন্তু তিনিতো এখন নেই।’

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন অরেকবারের কথা। সেই সময় রাজধানী ঢাকায় গনভবনে ডাক পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেবার দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পালা ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে তাদের গাড়ীতে তুলে নেয়ার সময় আপত্তি উঠল মুজিব কোট নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা তাকে অনুরোধ করলেন, গায়ের মুজিব কোটটি খুলে গাড়ীতে রেখে দিতে। তিনি বলেছিলেন-তাহলে আপনারা আমাকে নামিয়ে দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে মুজিব কোট নিয়েই সেই অনুষ্ঠানেও যাবার অনুমতি দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, তখন আমরা কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের গ্রামের বাড়ীতে। পশ্চিমা হায়েনারা এলাকায় এসে গেছে। তাই আত্নগোপনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। গায়ে মুজিব কোট। তার উপর শীতের চাদর গায়ে দিয়ে পথে বের হব। সাথে চকরিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এবং আমার স্ত্রীর বড় ভাই মোজাম্মেল হক। মোজাম্মেল ভাই আমার গায়ে মুজিব কোট দেখে প্রথমে অনুরোধ করলেন-যাতে এটি খুলে রেখে দিই। কেননা পথে ঘাটে রাজাকাররা যদি মুজিব কোট দেখে ফেলে তাহলে শেষ করে দেবে। আমি বললাম, মরলে মুজিব কোট গায়ে দিয়েই মরব।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডিতেও রাজধানী ঢাকায় ছিলেন কক্সবাজারের বঙ্গবন্ধু ভক্ত মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। ছিলেন তোপখানা রোডের হোটেল সম্রাটে। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর কারফিউ জারি করা হয়েছিল সেদিন। ১৫ আগষ্ট শুক্রবার জুমার নামাজের সময় কারফিউ শিথিল করা হয়েছিল। এসময় তিনি হোটেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন সাংবাদিক আবুল ফজল হাজারির বাসায়। সাথে ছিলেন কক্সবাজারের যুব লীগ নেতা সালাউদ্দিন মাহমুদ।

সালাউদ্দিন মাহমুদ অনেক আকুতি জানিয়েছিলেন-গায়ের মুজিব কোট খুলে রাখার জন্য কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। এমনকি সেদিন অনেক দলীয় নেতাই খুলে রেখেছিলেন মুজিব কোট। অনেকেই নাকি সেদিন তার সাথে থাকা নিরাপদ মনে না করে তাকে ছেড়েও দিয়েছিলেন।

১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির এমন ক্রান্তিলগ্নেও গায়ে মুজিব কোট নিয়ে তিনি ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে পৌছেন। তিনি বলেন-‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে মুজিব কোট গায়ে দিতেন সেটি আমিও দিই।’

প্রয়াত নেতা ফনিভুষণ মজুমদার যখন বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক ছিলেন তখন মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ছিলেন দলের পলিট ব্যুরোর সদস্য। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ট্য সহ সভাপতি। আশি দশকে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়ন পরিষদে উপর্যুপরি ২ বার চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।

আপাদ মস্তক একজন আওয়ামী লীগার এবং বঙ্গবন্ধু ভক্ত আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন- ‘মৃত্যুর সময়ও যাতে মুজিব কোটটি আমার গায়ে থাকে-এটাই আমার কাম্য।’

উল্লেখ্য, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মঙ্গলবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাত ৮ টা ৪০ মিনিটের সময় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। ইন্নালিল্লাহি….রাজেউন। তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

নোট: ২০১৫ সালের জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দৈনিক কালের কন্ঠে লেখাটি ছাপা হয়েছিল। মূলত কালের কন্ঠকে প্রয়াত মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়েই এই লেখাটি প্রকাশিত হয়।

লেখা তোফায়েল আহমদ, বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কন্ঠ।