টানা তৃতীয়বারের মতো মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে ইতিহাস গড়লেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। মেয়র পদে হ্যাটট্রিক করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের এই সহসভাপতি।

রবিবার সন্ধ্যায় নৌকার প্রার্থী আইভীকে বেসরকারিভাবে জয়ী ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

১৯২টি কেন্দ্রের ফলাফলে নৌকা পেয়েছে এক লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৭১ ভোট। ৬৯ হাজার ১০২ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে নৌকা।

২০১১ সালের প্রথম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আইভী। ২০১৬ সালে এই সিটির দ্বিতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনকে ৮০ হাজারের বেশি ভোটে তিনি পরাজিত করেন।

এর আগে রবিবার সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বিকাল চারটা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলে। ১৯২টি কেন্দ্রের সবগুলোতেই ইভিএমে ভোট হয়। ভোটগ্রহণ চলাকালে কোথাও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা খবর পাওয়া যায়নি। ভোটার উপস্থিতিও ছিল সন্তোষজনক। নির্বাচন কমিশন ধারণা করছে, এই নির্বাচনে ৫০ শতাংশ ভোট প্রদান করা হয়েছে।

মোট ভোটার সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৯ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫১৮ এবং তৃতীয় লিঙ্গের চারজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৯২টি এবং ভোটকক্ষ এক হাজার ৩৩৩টি।

মেয়র পদে নির্বাচন করেন সাতজন। সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ৩০ জন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমপক্ষে চার থেকে পাঁচটি টিম ছিল, যার প্রতিটি টিমে ছিল চার থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্য ও ২০ থেকে ২২ জন আনসার সদস্য।

ভোটে জিতেই রাজনীতিতে অভিষেক আইভীর

সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাবা আলী আহম্মদ চুনকা ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান। বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৮৫ সালে আইভী রাশিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনার জন্য ওডেসা পিরাগোব মেডিকেল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ১৯৯২ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরে দেশে ফিরে এসে ঢাকার মিডফোর্ট হাসপাতালে ইন্টার্ন করেন তিনি।

১৯৯৩ সালে আইভী শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে এলেও তিনি তখন তেমন কোনো সাড়া ফেলতে পারেননি। তবে নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পৌর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আইভী আলোচনায় আসেন।

২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করে। ২০১১ সালে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। বিএনপির সমর্থনে প্রার্থী হয়েছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন আইভী। ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার মধ্যেই ভোটের একদিন আগে তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। পরে লক্ষাধিক ভোটে শামীম ওসমানকে পরাজিত করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।

২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটিতে প্রথম দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। সেই নির্বাচনে তৃণমূল থেকে আইভীর নাম প্রস্তাব না করা হলেও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে আইভীকেই বেছে নেয়। তিনি বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনকে ৮০ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন।

সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে আছেন। নারায়ণগঞ্জের একই দলের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই বারবার বিজয়ী হয়ে নারায়ণগঞ্জে শক্ত অবস্থান দাঁড় করিয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।