লাইব্রেরি শব্দটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্তরে স্তরে সাজানো গোছানো বইয়ের বড় সমাহার। অর্থাৎ লাইব্রেরি হলো বই সংরক্ষণের ভাণ্ডার।

বর্তমান যুগে লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা তারাই অনুভব করতে পারে যারা শিক্ষিত সমাজ-পরিবেশে বসবাস করে এবং শহরে উচ্চতর লেখাপড়া করে। তাই লাইব্রেরি গড়ে ওঠে কেবল কিছু শহরে, বেশিভাগ শহুরে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই লাইব্রেরি দেখা যায়। তবে কিছু সচেতন মানুষের  উদ্যোগে গ্রামগঞ্জে, মফস্বল স্কুল-কলেজেও লাইব্রেরি নির্মিত হয়েছে তা স্বীকার করতে হয়। তবে সেটা তুলনামূলক অনেক কম।

আর আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে লাইব্রেরি নেই বললেই চলে। সরকারিভাবে জেলাভিত্তিক পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ করা হলেও নেই প্রয়োজনীয় বই। লাইব্রেরিগুলো সারাবছর তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। যার কারণে শিশু-কিশোররা পাঠ্যবই ছাড়া অন্যকিছু পড়ার সুযোগ পায় না। নতুন জ্ঞানের সন্ধান মেলে না,  জ্ঞানের জগৎ থেকে অনেক দূরে রয়ে যায়।

শুধু পার্বত্য জেলাই নয়, বাংলাদেশে আরো অনেক জেলা শহর আছে যেখানে ভালো কোনো লাইব্রেরি নেই। যে অঞ্চলে লাইব্রেরি নেই, সেসব অঞ্চলের মানুষ বড় স্বপ্ন দেখতে পারে না, বড় চিন্তা-ভাবনা করতে পারে না। যার ফলে সেসব অঞ্চলে মানুষের জীবনবোধ স্থির থেকে যায়, জীবন পশ্চাৎপদ হয় এবং বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়।

সেই চিন্তাভাবনা থেকে বান্দরবান জেলায় নিজ এলাকার শিশু-কিশোরদের এগিয়ে নিতে ছোট একটি স্বপ্ন দেখেছি, নিজ গ্রামে ছোট একটি লাইব্রেরি নির্মাণের। যেখানে বসে তারা পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে পারবে, একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাবে। শিশু-কিশোররা উন্নত চিন্তা করতে পারবে, বড় স্বপ্ন দেখতে পারবে। তাছাড়া তারা যেন বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস, আনন্দ, সৌন্দর্য এবং মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়।

তারা যেন উচ্চতর জীবন সন্ধান ও উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পায় সেই ইচ্ছা নিয়ে ২০১৭ সালে আমরা কয়েকজন মিলে বান্দরবানে নিজ গ্রামের নামে অর্থাৎ ‘হাংসামা পাড়া লাইব্রেরি’ নামে ছোট একটি লাইব্রেরি স্থাপন করি। এটি বান্দরবান জেলা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি উপজেলা রোডে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।

প্রথম দিকে নিজেদের জমানো টাকা আর কয়েকজন হৃদয়বান মানুষের কিছু অনুদান দিয়ে বাঁশের ঘর তৈরি করে ২২০টা বই নিয়ে যাত্রা করি। পরে আমাদের বান্দরবানের সংসদ সদস্য মহোদয় বীর বাহাদুর উশৈসিং এর দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে তিনি দুই রুমবিশিষ্ট একতলা ভবন নির্মাণের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

লাইব্রেরি শব্দটি মূলত ল্যাটিন ‘লিবার’, এক ধরনের গাছের ছাল এবং পরে ‘লিব্রারিয়াস’ হয়ে অ্যাঙ্গো-ফ্রেঞ্চের ভাষায় ‘লাইব্রেরিয়া’ থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘লাইব্রেরি’ শব্দটি উদ্ভব হয়। আমরা চাই প্রতিটি গ্রামে ছোট ছোট লাইব্রেরি গড়ে উঠুক এবং প্রতিটি গ্রামে আলোকিত মানুষ গড়ে উঠুক।

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই লাইব্রেরির ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাচীন মিসরিয় সভ্যতা থেকে গ্রিক সভ্যতা এবং প্রাচীন যুগ হতে বর্তমান আধুনিক যুগ পর্যন্ত লাইব্রেরি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা গেছে। মানুষ প্রাচীন যুগ হতে জ্ঞান আহরণ করে এবং তা প্রয়োগ করে নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ও পরিবর্তন করার মাধ্যমে জীবকুলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান রেখে চলছে। মানুষের এ অপরিসীম জ্ঞানের উৎস ও বাহন হচ্ছে বই, আর বইয়ের প্রধান বাহক ও রক্ষক হচ্ছে লাইব্রেরি।

এছাড়া মানুষ হলো আলোক পথচারী। আলোর পথে এগিয়ে মানুষ হতে চায় আরো আলোকিত মানুষ। মানুষের মনে ধারন করে অসম্ভব রকমের জানা-বোঝা ও জ্ঞানাহরণের ইচ্ছা এবং জ্ঞানের তৃষ্ণা। সে আজ নিজেকে বিশ্বপথিক হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। মানুষের এ আলোকিত জীবন-সংস্কৃতির প্রথম ও প্রধান অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সে লাইব্রেরি থেকে আহরণ করেছে। মানুষ যেখানেই জানতে বা শিখতে ব্যর্থ হয়েছে, অমনি লাইব্রেরিতে ছুটতে বাধ্য হয়েছে।

তাই আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘একটা ব্যাপার তোমাকে অবশ্যই জানতে হবে, আর সেটা হল- পাঠাগারটা কোথায়?’ সুতরাং লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এছাড়া লাইব্রেরির সঙ্গে জ্ঞানী-গুণী কিংবা কবি-লেখকদের একটা যোগসূত্র রয়েছে। নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের সান্নিধ্য পেতে পারি।

আমরা বিশ্বাস করি একটি ভালো বইয়ের লেখক নিশ্চয় ভালো মানুষ, নানা গুণের অধিকারী ও জ্ঞানী। এমনই পৃথিবীর সব জ্ঞানী তাদের জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গি, সুচিন্তা-মনন সম্পর্কে বা তাদের জ্ঞান, বিদ্যা ও সাধনার সৃষ্টিগুলোকে বইয়ে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সেই বইয়ের ভাণ্ডার বা সংগ্রহ হলো লাইব্রেরি। তাহলে এ শত শত জ্ঞানী-গুণী মানুষদের চিনতে হলে, তাদের জ্ঞান, বিশ্বাস, স্বপ্ন ও সাধনার সৃষ্টিকে বুঝতে হলে লাইব্রেরিতে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক পরিচিতি: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়