উচ্ছ্বাস-উৎকণ্ঠা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। গতকাল সোমবার মধ্যরাত শেষ হয়েছে প্রচারণা। আগামীকাল বুধবারের ভোট উৎসবের অপেক্ষায় আছে চট্টগ্রাম নগরীর মানুষ।

নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী গত ৮ জানুয়ারি থেকে ৭ মেয়র প্রার্থী ও ২২৫ জন কাউন্সিলর প্রার্থী উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন।

নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, ভোট গ্রহণ শুরুর আগে ৩২ ঘণ্টা, ভোটগ্রহণের দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা এবং ভোটের দিন রাত ১২টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি কোনও জনসভা আহ্বান, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান এবং কোনও মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যায় না। সে হিসেবে গতরাত ১২টায় প্রচার-প্রচারণা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নগরীতে মাইকের প্রচারণা বন্ধ হয়ে গেছে রাত ৮টায়। বুধবারের ভোটগ্রহণে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

গতকাল শেষ দিনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী নিজ বাড়ি এলাকা বহদ্দারহাট ও আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। এছাড়া তার সমর্থনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও এসএম কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বে মহানগর আওয়ামী লীগ, রিয়াজ-ফেরদৌস-পূর্ণিমার নেতৃত্বে চলচ্চিত্র তারকাদের দল এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা কমিটি নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথকভাবে গণসংযোগ ও মিটিং-মিছিল করেছেন।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনও গণসংযোগ, নেতাকর্মীদের সাথে পৃথক পৃথক বৈঠক করে দিক-নির্দেশনা প্রদানসহ বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করেন। এছাড়া, তিনি দুপুরে নাসিমন ভবনস্থ নগর বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। এসময় শাহাদাত ১৯ জানুয়ারি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপি নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হলে চট্টগ্রাম নির্বাচন কার্যালয়ে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত মেয়র প্রার্থী এমএ মতিন গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন শেষদিনে। এসময় তিনি নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন ও ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত করে জনদুর্ভোগ লাঘব করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে উৎসব-উত্তাপ থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীদের প্রচারণার কারণে নগরবাসীকে কোনো ধরণের ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। সড়ক বন্ধ করে মিছিল-মিটিংয়ে যেমন জনদুর্ভোগ হয়নি তেমনি মাইকের প্রচারণায় কান ঝালাপালাও হয়নি। দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকের প্রচারণার বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা হয়েছে। তবে গতানুগতিক ধারার বাইরে প্রত্যেক প্রার্থীর প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে ভিন্নমাত্রা। ডিজিটাল প্রচারণায় পেয়েছে শৈল্পিক রূপ। ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে সশরীরে না গেলেও প্রার্থীরা ঠিকই পৌঁছে গেছেন ভোটারের কাছে। এর মাধ্যমে কোনো প্রার্থীর মার্কা কি বা নির্বাচনে তার প্রতিশ্রুতি সবই পৌঁছানো গেছে ঘরে ঘরে।

বুধবারের নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করতে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন

করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ১১ হাজার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে চট্টগ্রামে। আজ সকাল থেকে এসব মেশিন নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে পৌঁছে যাবে। ১৬ হাজার ১৬৩ জন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ইভিএমে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তারাও আজকের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রে পৌঁছে যাবেন। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে যা যা দরকার সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন সামনে রেখে নগরীতে টহল শুরু করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান বলেন, ‘নগরীর ৭৩৫ ভোটকেন্দ্রের ৪ হাজার ৮৮৬ বুথের জন্য একটি করে এবং আরও ৭৩৫টি ইভিএম দেয়া হবে। ফলাফল ঘোষণাসহ নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য ইতিমধ্যে এমএ আজিজ স্টেডিয়াম এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।’

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, চসিক নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন ২৫ প্লাটুন (৭৫০ জন) বিজিবি, ৪৯২ জন র‌্যাব, ৪ হাজার ৩০৮ জন পুলিশ এবং ৮ হাজার ৮২০ জন আনসার সদস্য। আজ সোমবার থেকে ভোটের আগে-পরে চার দিন দায়িত্ব পালন করবেন তারা। এবারের নির্বাচনে সব বাহিনী মিলে মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। পাশাপাশি মাঠে থাকছে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। মোবাইল টিম থাকবে ৪১০টি, স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে ১৪০টি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন ৭৬ জন। প্রতি ওয়ার্ডে ১ জন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া বিজিবির প্রতি প্লাটুনে ১ জন করে এবং র‌্যাবের সাথে ৩ জন দায়িত্ব পালন করবেন। ইভিএমের কারিগরি সহায়তায় প্রতি ভোট কেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর দুজন করে সদস্য নিযুক্ত থাকবেন।

এদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর নির্বাচনের দিন এবং আগে-পরের দিনগুলোতে নগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এ লক্ষ্যে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি যেকোনো ধরণের অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা নাকচ করে দেন।