নানা রেকর্ড সৃষ্টির মধ্য দিয়ে জোসেফ বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের এই ফলাফল না মেনে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও তার পরিবার থেকেই এই অর্থহীন কৌশল থেকে নিবৃত হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ফলে ট্রাম্প এবং তার উগ্র অনুসারীরা ধীরে ধীরে শান্ত হবেন বলে আশা করা যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প শাসনের চার বছর সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সময়ের একটি। ব্রোকিংস ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের শাসন যেভাবেই হোক আমেরিকান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। সেটি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের পাগলামো ধরনের উগ্র বক্তব্যের জন্য হলেও। ট্রাম্পবাদ বা ট্রাম্প শাসনকে যে যেভাবে মূল্যায়ন করুক না কেন, এমনকি হেরে যাওয়ার পর তার সমর্থকদের ফল না মানার মন্তব্য আমেরিকান গণতন্ত্র চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও মার্কিন সমাজের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ব্যক্তিগতভাবে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের বহুলালোচিত সন্ত্রাসী ঘটনার আগের বছর ২০০০ সালে এবং পরের বছর ২০০২ সালে সংবাদকর্মীদের জন্য আমেরিকান সরকারের দু’টি ভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। ওই সময় ওয়াশিংটন নিউ ইয়র্ক ছাড়াও ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, টেক্সাস ও নেভরাস্কার বিভিন্ন স্থান ও পরিবেশের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর সূচনাকালের এই কয়েক বছর ছিল আমেরিকান সমাজে মূল্যবোধ ও চেতনায় পরিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। ২০০০ সালে ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাট শাসনের মেয়াদ শেষে জুনিয়র বুশের রিপাবলিকান শাসনের সূচনা হয়। জুনিয়র বুশের সময় নাইন-ইলেভেনের ঘটনা ঘটে এবং তিনি মুসলিম দেশগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেন। এর দুই দশক পরে ট্রাম্পের আলোচিত শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটছে। মাঝখানে বারাক ওবামার আট বছরের ডেমোক্র্যাট শাসন পার হয়েছে। যে জো বাইডেন আগামী জানুয়ারির শুরুর দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি ওবামা প্রশাসনের পুরোটা সময়জুড়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

অনেকসময় উদ্ভট কথাবার্তা ও আচরণ দিয়ে ‘ট্রাম্পবাদ’কে বোঝানো ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি তার চেয়ে আরো গভীর বলেই বিশ্ববাসীর মধ্যে ট্রাম্প সম্পর্কে অপছন্দের ঢেউ বয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে সর্বাধিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড স্থাপিত হওয়ার পরও হেরে যাওয়া প্রার্থী হিসেবেও ট্রাম্প সর্বাধিক ভোট প্রাপ্তির রেকর্ড করেছেন। আমেরিকান ভোটের ফলাফলের মানচিত্রের দিকে অবলোকন করলে দেখা যাবে, পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণের কিছু অভিবাসীপ্রধান রাজ্য বাদে মাঝখানের বিশাল অংশজুড়ে লালের জয় হয়েছে। আর চার বছর পরপর যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় তাতে এই চিত্রের বড় পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তনশীল রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছয় থেকে আটটি অঙ্গরাজ্যই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করে।

এবারের নির্বাচনকে বলা হচ্ছে সবচেয়ে বিভক্তিপ্রবণ ভোটের নির্বাচন। এতে ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন আর ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে ট্রাম্প হেরেছেন। আমেরিকান নির্বাচনে প্রধান দু’টি ভোটবলয় রয়েছে। এর একটি হলো রক্ষণশীল ধর্মপ্রাণ ভোটবলয়, অপরটি উদার ও ভারসাম্যবাদী ভোটবলয়। মাঝখানে দোদুল্যমান ভোটারদের একটি অংশ রয়েছে। ইভানজেলিক্যান খ্রিষ্টানরা হলো প্রথম পক্ষের ভোটবলয়ের মূল ভিত্তি। প্রায় ৩৩ শতাংশ আমেরিকানের ওপর খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক এই শ্রেণীর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। যাদের সাথে নিউকন ও জুদাইজম সমর্থকদের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। অন্য দিকে, ৩৩ শতাংশ আমেরিকান হলো অশ্বেতাঙ্গ বর্ণের যাদের সমর্থন থাকে উদারনৈতিক ও সাম্যধারার পক্ষে। অন্য কথায় ধর্মপ্রাণ কট্টর জাতীয়তাবাদী চেতনার আমেরিকানরা মোটাদাগে রিপাবলিকান পার্টিকে সমর্থন করে। আর অশ্বেতাঙ্গদের বেশির ভাগ, উদারপন্থী, সমকামী, মুক্ত অভিবাসনের পক্ষের লোকজন ডেমোক্র্যাট দলকে সমর্থন করে। এই দুই মোটাদাগের বিভাজনে দোদুল্যমান ভোটাররাই আমেরিকান নির্বাচনের ফলাফল এক দিকে নিয়ে যায়। তারা আমেরিকান অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিষেবা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়ার নীতিতে প্রভাবিত হন। রিপাবলিকানরা যেখানে সবসময় কর রেয়াতের নীতি সমর্থন করায় বড় করপোরেট হাউজগুলোর আনুকূল্য লাভ করে সেখানে অপেক্ষকৃত নিম্ন আয়ের ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের বেশি সমর্থন করে।

এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ঘোষণা হওয়ার পর জো বাইডেন তার প্রথম ভাষণে আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আমেরিকান জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী চেতনা সুপ্তভাবে সব সময় লক্ষ করা যেত। সেই সুপ্ত বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রচারণায় নিয়ে এসে ট্রাম্প প্রথম দফায় সাফল্য পান আর দ্বিতীয় মেয়াদে হন বিফল। তবে অর্ধেকের কাছাকাছি আমেরিকান ট্রাম্পের নীতিকে সমর্থন করেছেন। ফলে বাইডেন যে ঐক্যবদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আমেরিকান রাষ্ট্রের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাতে অর্ধেক আমেরিকানের চেতনা বাদ যাবে না। তিনি হয়তো শ্বেতাঙ্গদের অধিকার ও মর্যাদাকে উচ্চকিতই রাখবেন তবে অশ্বেতাঙ্গদের অধিকারকে পদদলিত করে নয়।

ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট শাসনে আমেরিকান অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। আর রিপাবলিকান শাসনে দুরবস্থা নেমে আসে। ট্রাম্পের বিদায়ী মেয়াদটি ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। করোনার মতো দুর্যোগের সময়ও আমেরিকান অর্থনীতির স্থিতি তিনি মোটামুটি ধরে রাখতে পেরেছেন। জুনিয়র বুশের পর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে অর্থনীতির গতি ফেরাতে ওবামাকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। বাইডেনকে সম্ভবত সে অবস্থায় পড়তে হবে না। যদিও করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অন্য অনেক দেশের মতো তাকেও সামলাতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমর্থন দিয়ে নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি করতে হবে। বাইডেনের নামের প্রথম অংশ হলো জোসেফ বা ইউসুফ যিনি প্রাচীন মিসরীয় শাসনে অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে স্থিতি ও সমৃদ্ধি আনতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। বাইডেনের অতীত অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি চাঙ্গা করার ব্যাপারেও আমেরিকানরা আস্থা রেখেছেন বলে মনে হয়।

জো বাইডেনের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো পররাষ্ট্র সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে মৌলিকভাবে ভিন্নমত পোষণের বিষয়টি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কগুলোতেও বাইডেনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে আমেরিকান রাজনীতির গভীর বিষয়গুলো যারা অধ্যয়ন করেন তারা জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে ডিপস্টেট বা ক্ষমতাবলয় রয়েছে সেটি বিশেষ দল নিয়ন্ত্রিত নয়। আমেরিকান দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিক স্বার্থকে তারা এগিয়ে রাখে। দুই প্রধান দলের প্রার্থী নির্বাচন ও চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এই ক্ষমতাবলয়ের বিশেষ প্রভাব থাকে বলে মনে করা হয়। পেন্টাগন সিআইএ এফবিআইসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক, বৃহৎ করপোরেশন গোষ্ঠীর কর্ণধাররা এই ক্ষমতাবলয়ে রয়েছেন বলে মনে করা হয়। আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি- সেটি ওবামা ট্রাম্প বা বাইডেন প্রশাসন যার অধীনেই হোক না কেন তা নির্ধারণে এই বলয়ের প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠতে কেউ পারেননি বা পারবেন না। জো বাইডেন বা কমলা হ্যারিস আমেরিকান পররাষ্ট্র সম্পর্কে ততটুকুই পরিবর্তন আনতে পারবেন যতটুকু পর্যন্ত এই ক্ষমতাবলয় যেতে দেবে।

নতুন মেয়াদে বাইডেনের সামনে পররাষ্ট্র সম্পর্ক প্রশ্নে চলে আসবে চীন, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান এবং ইউরোপের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি। একইভাবে আসবে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্কের বিষয়ও।

নির্বাচিত হওয়ার আগে ও পরে বাইডেনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি বিশ্ব জলবায়ু ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ যেসব বৈশ্বিক সংস্থা থেকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে এসেছেন সেখানে ওয়াশিংটনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন। এর মাধ্যমে বাইডেন এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন বলে মনে হয় যে, বিশ্ব নেতৃত্বে আমেরিকাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইউরোপের যে মতব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিল তার একটি কারণ হলো বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে আসা। বাইডেন এই দূরত্বটা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারেন।

উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক এখনকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধের শুরু, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীনসাগর ইস্যু নিয়ে কট্টর অবস্থান, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে সীমিত করতে ভারতসহ চার পাশের দেশগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে চীনা নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত ভারসাম্য ভেঙে ফেলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। চীনের সাথে সম্পর্কের এই সমীকরণে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য যাই থাকুক না কেন, আমেরিকান ক্ষমতাবলয়ের মোটাদাগে অনুমোদন রয়েছে বলে মনে হয়।

ফলে চীনের ব্যাপারে বিশেষত দক্ষিণ চীনসাগরে বেইজিংয়ের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা ও তাইওয়ানের ব্যাপারে বিশেষ সমর্থন থেকে ওয়াশিংটন সরে আসবে বলে মনে হয় না। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ এবং চীন থেকে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে তা ভারত বা অন্য দেশে স্থাপনের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তাতে বিরতি আসতে পারে। ট্রাম্পের এই উদ্যোগে বহু মার্কিন কোম্পানি বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। চীনের সাথে আমেরিকান বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বাজারসুবিধার মধ্যে যে এক ধরনের সমন্বয় ছিল তাতে আঘাত হেনেছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প চীনের সাথে যে বাণিজ্যযুদ্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন তার অনেক কিছুই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার রীতি-নীতির খেলাপ বলে বেইজিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। এটি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন বাইডেন। সার্বিকভাবে বাইডেন শাসনে চীনের সাথে কৌশলগত বৈরিতার মধ্যেও এক ধরনের কাজের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। আর করোনা-উত্তর সময়ে চীনবিরোধী সর্বাত্মক লড়াইয়ের যে ডংকা ট্রাম্প বাজাচ্ছিলেন সেটি কিছুটা স্তিমিত হতে পারে। তবে করোনা বিস্তারে চীনের পরিকল্পিত সম্পৃক্ততার ব্যাপারে বৈশ্বিক নীতি প্রণেতারা নিশ্চিত হলে অন্য এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে চীনের ব্যাপারে। ইউরোপের এক সেনাপ্রধানের আরেক মহাযুদ্ধের হুঁশিয়ারিতে সে ধরনের ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃশ্যত দুজন সরকারপ্রধানের সাথে সুখানুভূতির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হতো। একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অন্যজন ইসরাইলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মোদি যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের এক নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিয়ে আবার ট্রাম্পের দরকার বলে মন্তব্য করেন। সেই ট্রাম্পের পরাজয়ে ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো টানাপড়েন হবে কি না সেই আলোচনা এখন হচ্ছে। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের উদ্যোগ ওবামা প্রশাসনের সময়ও ছিল। ওবামা নিজে ভারতকে এই অঞ্চলের নেতা বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত দর্শনের সাথে মোদি মতবাদের বিশেষ মিল থাকায় এ সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হয়। জো বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় উগ্রতা অপছন্দ করেন। বিজেপির রাষ্ট্র পরিচালনার উগ্র দর্শনেরও তিনি বিভিন্ন সময় সমালোচনা করেছেন। অন্য দিকে নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ভারত-জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত হলেও তিনি একাধিকবার মোদির কাশ্মির নীতির সমালোচনা করেছেন। এসবের প্রভাব ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গভীরতাকে যে মাত্রাতেই হোক না কেন, কমাতে পারে।

মোদির সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও তারা আফগানিস্তানে শান্তি-প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার জন্য পাকিস্তানের সাথে একপর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিল। এ ক্ষেত্রে চীনের অতি ঘনিষ্ঠতাকে বাধা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল পেন্টাগন থেকে। এমনকি নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগের সাথেও ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে বলা হচ্ছিল। বাইডেন ক্ষমতায় চলে এলে সে এজেন্ডা এবার আর সামনে এগোবে বলে মনে হয় না। ডেমোক্র্যাট শাসনের সাথে নতুন পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের সম্পর্কের উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্রাম্পের পুরো মেয়াদজুড়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেয়ার ব্যাপারে অভিযোগ ছিল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। সেটি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। রাশিয়ান মিডিয়াগুলোর খবর পর্যবেক্ষণ করলেও মনে হয় দেশটি ট্রাম্পকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় দেখতে চাইছে।

বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটন-মস্কোর পুরনো বোঝাপড়া অব্যাহত না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ট্রাম্প তার পররাষ্ট্র কৌশলে রাশিয়াকে ছাড় দিয়ে চীনকে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বাইডেনের সময়ে ক্রেমলিন আবার মূল প্রতিপক্ষের স্থানে চলে আসতে পারে। সম্ভবত এ কারণে এ কলাম লেখা পর্যন্ত পুতিন বাইডেনকে অভিনন্দন জানাননি।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য কৌশল ছিল সবচেয়ে আলোচিত। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য নীতি সাজিয়েছেন তার ইহুদি জামাতা কাম উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের পরামশমত। আর কুশনার ও তার টিম মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সব কিছু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শে করেছেন বলে মনে করা হয়। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং জর্দান উপত্যকা ও পশ্চিম তীর অঞ্চলকে ইসরাইলের মানচিত্রভুক্ত করতে সম্মতি দেয়া এ সব কিছুই নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা অংশ মনে করা হয়। সর্বশেষ উপসাগরীয় দেশগুলোকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই স্বীকৃতি দিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই চাপের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথে গিয়েছে। ওমান ও সৌদি আরবের কথাও বলা হয়েছে যে, তারা খুব দ্রুত ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে।

ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বাইডেন প্রশাসন এই অতি কট্টর ইসরাইলবান্ধব নীতি অনুসরণ করবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে ছিল। এখন বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্পের নেয়া সব কাজ আগের অবস্থানে হয়তো নিয়ে যাবেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের সাথে একাকার করে ফেলা থেকে নিবৃত হতে পারেন। হামাস বাইডেনের নির্বাচিত হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। ফাতাহও ইতিবাচকভাবে দেখছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোনো-না-কোনো ফর্মে আবার আলোচনায় আসতে পারে বাইডেনের এই মেয়াদে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ইরানের পরমাণু চুক্তি। বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। ইসরাইলের অভিবাসন মন্ত্রী হুমকি দিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন আবার এ চুক্তিতে গেলে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ হতে পারে। এরপরও বাইডেন পরমাণু চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার বিষয় বিবেচনা করতে পারেন। এটি ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবার প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে ইরান। একই সাথে একেবারে চীন-রাশিয়ান বলয়ের ভেতরে চলে যাওয়া থেকে তেহরান নিবৃতও হতে পারে।

এই ইরান নীতির ওপর সৌদি ও আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেকখানি নির্ভর করতে পারে। ওবামার আমল থেকেই সৌদি আরবের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপড়েন চলে আসছিল। ট্রাম্পের সময় ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্তে এ সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। বাইডেনের আশপাশে এমন কথা এখন শোনা যায় যে, মার্কিন প্রশাসন একনায়কদের আর পৃষ্ঠপোষকতা দেবে না। সেটি সত্যি হলে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক ধরনের পরিবর্তন সূচিত হতে পারে।

বাইডেনের জয়ের পর মুসলিম ব্রাদারহুড তাকে স্বাগত জানিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বহুমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার প্রতি নতুন প্রশাসন সম্মান জানাবে। ব্রাদারহুডের এই প্রত্যাশার আড়ালে অনেক বার্তা যুক্ত রয়েছে বলে মনে হয়।

তবে বাইডেন ক্ষমতায় আসায় মধ্যপ্রাচ্যে ব্রাদারহুডকে সমর্থনকারী দেশ তুরস্কে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৬ সালে এরদোগানের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ওবামা-বাইডেন ক্ষমতায় ছিলেন। ওই অভ্যুত্থানের পেছনে ওবামা প্রশাসনের মদদ ছিল বলে মনে করা হয়। সম্ভবত এ কারণেই তুর্কি নেতৃত্ব এখনো বাইডেনকে অভিনন্দন জানানোর জন্য অপেক্ষায় আছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই বাইডেন তুরস্কে গণতান্ত্রিকভাবে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ নিয়ে আঙ্কারায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। এ কথা সত্যি যে, চার বছর আগে তুরস্কের যে অবস্থা ও ভূমিকা ছিল সেটি এখন অনেক পাল্টে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ভূমিকা পালন করতে হলে তাদের এই ন্যাটো মিত্রকে উপেক্ষা করার অবস্থা নেই। আর এরদোগান ও একে পার্টির শেকড়ও এখন দেশটির ক্ষমতাবলয়ের অনেক গভীরে।

বাইডেন এখন প্রশাসন সাজানোর প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে বোঝা যাবে বাইডেন ঠিক কোন দিকে তার নীতি-কৌশলের তরী বাইবেন। তবে বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার অধিকারী সত্তরোর্ধ্ব বাইডেন এমন একসময় দেশের হাল ধরতে চলেছেন যখন পরিবর্তনের নতুন এক ঢেউ মনে হয় বিশ্বের নানা প্রান্তে উথলে উঠতে শুরু করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাণ্ডারি পরিবর্তনের এই ক্রান্তিলগ্নে অপেক্ষা করতে হবে কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে ঢেউ তোলে তা দেখার জন্য।

[email protected]