১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে নয় মাস যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলো ঠিকই, কিন্তু পূর্ণ বিজয়ের স্বাদ পাওয়া গেল সেদিন, যেদিন হানাদারদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু। বিজয়ের ২২ দিন পর তার মুক্তির সংবাদের মধ্য দিয়ে জাতি বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে।

জাতির জনক পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ভোররাতে। এদিন বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল হোসেনকে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় তাঁরা পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। বেলা ১০টার পর থেকে বঙ্গবন্ধু কথা বলেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দিন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ আরও অনেকের সঙ্গে। প্রাণপ্রিয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা হয় তাঁর। পরে ব্রিটেনের বিমানবাহিনীর একটি বিমানে করে পরদিন ৯ জানুয়ারি দেশের পথে যাত্রা করেন।
দেশের মানুষ কেমন আছে?
কারাগার থেকে বেরিয়েই বঙ্গবন্ধু প্রথম জানতে চেয়েছেন দেশের মানুষের কথা। কেমন ছিল, কেমন আছে তারা? ৮ তারিখে লন্ডন থেকে তার কথা হয় সহযোদ্ধা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে বলেন, ‘হ্যালো তাজউদ্দিন, আমি সাংবাদিক পরিবেষ্টিত আছি, তাদের কী বলবো? দেশের মানুষ কেমন আছে? বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বাংলাদেশে যে অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশু
নিহত হয়েছেন, এই মুহূর্তে তাদের কথা আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে।’
দীর্ঘ ৯ মাস কারাবাসের পর ১৯৭২ সালের এই দিন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয় পাকিস্তান সরকার। পাঠানো হয় লন্ডনে। এ খবরে বঙ্গবন্ধুর পরিবার, দেশের আপামর জনসাধারণ ও বিশ্ব নেতৃত্বসহ সবার চোখ ছিল লন্ডনে। সবার মুখে এক প্রশ্ন- স্বাধীন দেশে কবে ফিরবেন তিনি?

মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন

লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলের সম্মেলন কক্ষে প্রবেশের সময় বঙ্গবন্ধুকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে অভিনন্দিত করা হয়। জানতে চাওয়া হয় কেমন ছিলেন তিনি, কোথায় ছিলেন।

একটি খুব খারাপ স্থানে, কল্পনাতীত একাকিত্বে বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনও রেডিও নেই, চিঠি নেই। বাইরের জগতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগই ছিল না। মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। যেদিন জেলে নেওয়া হলো সেদিন বাঁচবো কিনা ধারণা ছিল না। তবে এটা জানতাম বাংলাদেশ মুক্ত হবেই। আমার দেশের লাখ লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছে। নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্ক রাখবে এমন কোনও প্রতিশ্রুতি তিনি ভুট্টোকে দেননি উল্লেখ করে বলেন, “যখন তার (ভুট্টো) দেশের জনগণ তাকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে, তখন আমি ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায় কখনও প্রকাশ করা হয়নি।”

পরিবারের জন্য আধাঘণ্টা

দেশের মানুষের জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠা মানুষটি এমনভাবে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন যে দীর্ঘদিন পর মুক্তি পেয়েও পরিবারকে তিনি মাত্র আধাঘণ্টা সময় দিতে পেরেছিলেন।

লন্ডন থেকে টেলিফোনে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের প্রতি বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রশ্ন ছিল- ‘বেঁচে আছো তো?’ ২৫ মার্চের দুর্বিসহ কালোরাতের এক বছর পর ৮ তারিখ শনিবার সন্ধ্যার একটু আগে হোটেল থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আধাঘণ্টা কথা বলেন তিনি।

১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আশেপাশে যারা ছিলেন তারা বলছেন, যতবারই তিনি দেশের মানুষের কথা শুনেছেন, দেশে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের কথা শুনেছেন, তার চোখ ভিজে এসেছে। তিনি দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। হোটেলের সামনে হাজার হাজার বাংলাদেশি শীত উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুকে এক পলক দেখার জন্য। বাইরে তখন কেবল ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান।

১৯৭২ সালের ৮ জুন প্রকাশিত দৈনিক বাংলা১৯৭২ সালের ৮ জুন প্রকাশিত দৈনিক বাংলা

নেতা হাসছেন নেতা ভাসছেন

মুক্তির পরের তিন দিন বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় এলেন। সে সময় মাতৃভূমির কথা ভেবে কখনও হেসেছেন, কখনও ভেসেছেন কান্নায়।

এই দিন লন্ডনের হোটেলে আসেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতসহ বাংলাদেশের কয়েকজন নেতা। বঙ্গবন্ধু নয়াদিল্লি হয়ে দেশে ফিরবেন−ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপে তা নির্ধারিত হয় সেই দিনই। বাংলাদেশ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এসেছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর মনে তখন কেবলই দেশে ফেরা, দেশের মানুষকে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের স্বপ্ন।

সে সময় লন্ডনে ছিলেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। ১৫ থেকে ২০ জন হোটেলে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দিনটি ব্যস্ত কেটেছিল বঙ্গবন্ধুর। প্রথমে অবাক হলাম, স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ হোটেলে চলে এলেন। সেটি স্পষ্টতই ইংল্যান্ডের প্রটোকলের বাইরে। তৃতীয় বিশ্বের নেতাকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দেখতে হোটেলে চলে আসবেন, এটা অতীতে ঘটেনি। এমনটা বঙ্গবন্ধু বলেই সম্ভব হয়েছে।’