নোয়াখালীর ভাসানচরে পৌঁছেছে রোহিঙ্গাদের প্রথম দল। কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে স্থানান্তরের প্রথম ধাপের এ দলে রয়েছে ১ হাজার ৬৪২ জন নারী-পুরুষ ও শিশু।

শুক্রবার বেলা ২টার দিকে রোহিঙ্গাদের বনকারী জাহাজ ভাসানচরে ভেড়ে।

এদিন সকাল সোয়া ১০টার পর চট্টগ্রামের বোট ক্লাব, আরআরবি ও কোস্টগার্ডের জেটি থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাহাজগুলো ছেড়ে যায়। এর আগে বৃহস্পতিবার উখিয়ার আশ্রয়শিবির থেকে এই রোহিঙ্গাদের বাসে করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে মোট সাতটি জাহাজ তাদের নিয়ে

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে মোটামুটি ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য এই রোহিঙ্গাদের বুধবার রাতে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ঘুমধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। উখিয়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো করা হয় কয়েক ডজন বাস। বৃহস্পতিবার সেসব বাসে করে মোট পাঁচটি কনভয়ে উখিয়া থেকে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

রোহিঙ্গাদের বহনকারী বাসগুলোর সামনে ও পেছনে ছিল র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর রাতে তাদের রাখা হয় বিএএফ জহুর ঘাটির বিএএফ শাহিন স্কুল ও কলেজের ট্রানজিট ক্যাম্পে।

শুক্রবার সকালে তাদের নৌবাহিনীর ছয়টি এবং সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে তোলা হয় ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। জাহাজের ডেকে বেঞ্চ বসিয়ে সবার বসার ব্যবস্থা হয়।

সকাল সোয়া ১০টার পর চট্টগ্রামের বোট ক্লাব, আরআরবি জেটি ও কোস্টগার্ডের জেটি থেকে জাহাজগুলো ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় বলে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমকেজেড শামীম জানান।

নৌবাহিনীর দুটো জাহাজে করে রোহিঙ্গাদের ১০১৯টি লাগেজ বৃহস্পতিবারই ভাসানচরে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। শুক্রবার নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের আরও আটটি জাহাজ কনভয়ের সঙ্গে ভাসানচরে যায়।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসান চরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয় সরকার।

মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে আগেই ভাসানচরে নিয়ে রাখা হয়েছিল।

এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলকে দেখার জন্য ভাসান চরে পাঠানো হয়। তারা ফেরার পর তাদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসান চরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বলে জানানো হয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

তবে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সরকারের এই উদ্যোগ থেকে দূরত্ব রেখে চলেছে।

বুধবার এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ বলেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে নেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার করেছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। ভাসান চরে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যেন সব তথ্য জেনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট পরবর্তী মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।

ইতিপূর্বে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কার্যক্রম ঘিরে ভাসানচর দ্বীপ ঘুরে আসে ২২টি এনজিওর প্রতিনিধি দল। সরকারের পরিকল্পিত আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক একটি এনজিওর কর্মকর্তা বলেন, বারবার অভিযোগ উঠেছে এনজিওদের প্ররোচনায় রোহিঙ্গারা ভাসানচর যাচ্ছে না। তাই এবারের যাত্রায় কোনো এনজিও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তবে বেশ কিছু এনজিও সেখানে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে ঠাসাঠাসির বসবাস ছেড়ে ভাসানচরে যেতে ৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা রাজি হয়েছেন। তবে ৪ থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত।