ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে বিভিন্ন সময় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠছে মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে। যেসব মন্ত্রী-এমপিরা সিন্ডিকেট তৈরি করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিরোধ সৃষ্টি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

শনিবার (৭ মে) গণভবনে দীর্ঘ আড়াই বছর পর দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে থেকে দলীয় সভাপতি এ নির্দেশনা দেন। বিকাল সাড়ে পাঁচটায় এ বৈঠক শুরু হয়ে রাত ১১ টায় শেষ হয়। করোনা টেস্টে নেগেটিভ রিপোর্ট আসা দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা এতে অংশ নেন। সভার শুরুতেই কেন্দ্রীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ৭ মে ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে’ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
বৈঠক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের যত বড়ই নেতা ও মন্ত্রী-এমপি হোক না কেন, যারা দলের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট তৈরি করে দলীয় শৃঙ্খলা বঙ্গ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলের সভাপতি। এছাড়া যারা জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বিরোধীতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব নেতারা দলের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করেছেন, তারা যদি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও হন তাদের বাদ দিয়ে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে দ্রুত সম্মেলন শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আগামীতে তাদের মনোনয়ন তো দূরের কথা, কোনো পদ-পদবীও না দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

সূত্র বলেছে, বৈঠকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নেতারা আলোচনায় তুলেন। এসময় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন যথা সময়েই হবে। আমরা চাই বিএনপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এসময় বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা বলেন, বিএনপি তো নির্বাচনে অসবে না বলে জানিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে দলের সভাপতি বলেন, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক বা না করুক, সেটি মাথায় রেখে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা চেষ্টা করবো, বিএনপি যাতে নির্বাচনে অংশগ্রণ করে। কারণ নির্বাচন হবে সবার অংশগ্রহণমূলক। ইভিএমএ ভোট হবে। অর্থাৎ ভোট হবে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী বিরোধী দল কে হবে, সেটা ঠিক করা হবে। এছাড়া দলের উন্নয়ন প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে আরও কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর যদি বিএনপি আগের মতো তান্ডব চালায় সেক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগানো হবে। যাতে আন্দোলন বা নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে। নেত্রী যখন ডেট ফিক্সড করবেন, সেভাবেই হবে। তিনি এখন থেকেই গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র আপডেট করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তার আগে দলের সকল মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন করার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এছাড়া নীলফামারী ডোমার উপজেলার সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তাকে শোকজ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিভক্তি নিয়ে কখনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত দল। শৃঙ্খলার যেখানে যেখানে ঘাটতি আছে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেটা তারা করতে অসমর্থ হবেন সেটা নেত্রী পর্যায়ে আসবে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা বিদ্রোহী, কিন্তু দলের পদে আছে সেই সব জায়গায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করে মেয়াদোত্তীর্ণ সম্মেলনের কাজ শেষ করতে হবে। ইতোমধ্যে চল্লিশটা উপজেলায় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে এবং সাতটির মত জেলা সম্মেলনের প্রস্তুতি ১২ তারিখ থেকে নিচ্ছি। আগামী নির্বাচন এবং জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে সুশৃঙ্খল-সুসংগঠিত পার্টি হিসেবে আওয়ামী লীগকে দাঁড় করাতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের জন্য। আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। বিরোধীদলও যারা যারা নির্বাচন করবে, তাদেরকে স্বাগতম। নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনেই হবে। বিরোধী দল সভা সমাবেশ করলে, সেখানে বাধা না দিতেও নেত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক সভাপতি মন্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, এমন যত বড় নেতা বা এমপি-মন্ত্রী হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন দলীয় সভাপতি। এছাড়া আওয়ামী লীগের একটি আদর্শিক জোট রয়েছে ১৪ দল। এ ব্যপারে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছেন, ১৪ দলের শরিকদের সাংগঠনিক শক্তি কতটুকু আছে বা নেই, সেটি বড় বিষয় নয়। ১৪ দল আছে ও থাকবে। তবে মহাজোট থাকছে কি থাকবে না, সেটি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এছাড়া নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা চাই বিএপ নির্বাচনে অংশ নেবে। আর যদি অংশ না নেয়, সেক্ষেত্রে তখন দেখা যাবে। কারণ বিএনপি এখন নির্বাচনে আসবে না বললেও সময় মত তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। আর বিএনপি আন্দোলনের কথা বলছে, তারা আন্দোলন এখনও করতে পারেনি। যখন আন্দোলন করবে, তখন
দেখা যাবে কিভাবে মোকাবেলা করা যায় বলে জানিয়ে দিয়েছেন দলীয় সভাপতি।
সূত্র আরও বলছে, বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলের ২২তম কাউন্সিলের আলোচনা তুললে, দলীয় সভাপতি বলেছেন, দলের ২২তম জাতীয় কাউন্সিল যথা সময়ে হবে। এ জন্য গঠনতন্ত্র আপডেট করতে নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সভাপতি। একই সঙ্গে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাদের নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ইশতেহার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। এছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ যদি কোনো অপকর্ম করে, তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সে যত বড়ই নেতা হোক সেটি দেখার বিষয় নয়।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একাধিক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, আমাদের কাছে দলের সভাপতি বিভাগীয় সাংগঠনিক অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন। তিনি যেভাবে জানতে চেয়েছেন, সেইভাবে আমরা আমাদের রিপোর্ট নেত্রীর কাছে দিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করতে যেসব জেলা-উপজেলার সম্মেলনের মেয়াউত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেগুলোর সম্মেলন শেষ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে শুধু আওয়ামী লীগই নয়, সহযোগি ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন শেষ করতে তাগিদ দিয়েছেন। আর যেসব এলাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেগুলো নিরসন ও মান অভিমান দূর করারও তাগিদ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে যারা দলের বিরোধীতা করেছেন, বিভিন্ন সময়, তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যতব বড়ই নেতা বা এমপি-মন্ত্রী হোক।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এ বৈঠকে দল, সহযোগি ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে আমরা কি কি করেছি, সেটি নেত্রীকে অবহিত করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ২২তম কাউন্সিল। এ জন্য গঠনতন্ত্র আপডেট করতে বলা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কাউন্সিলের বিষয়ে আলোচনা হয়। সেগুলো যথা আগামী ডিসেম্বরের আগেই শেষ করতে বলা হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিএনপিসহ সাবই যাতে নির্বাচনে অংশ নেয় সেই লক্ষ্য রেখে সবাইকে ঐক্য বদ্ধ থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞাণ ও প্রযুক্তি বিষয়ক আব্দুস সবুর সময়ের আলোকে বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলা হয়েছে, যাতে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে কোনো চ্যালেঞ্চ মোকাবেলা করা যায়। যেসব জায়গায় সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেখানে সম্মেলন শেষ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ দলের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কাজ করেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলেছেন দলীয় সভাপতি।