আজ ৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ^ব্যাপী শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবরকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাসের এ সময়ে দেশে দুর্দশায় পড়েছেন শিক্ষকরা। টানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে না হলেও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ১০ লাখেরও বেশি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী। বেতনের সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনিও বন্ধ হওয়ায় সঙ্কট আরও বেড়েছে। শিক্ষক বলে সমাজে একটা ভিন্ন অবস্থান থাকায় কারও কাছে হাতও পাততে পারেন না, আবার নিজেও চলতে পারছেন না।

প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক বেতনের বাইরে বেসরকারি শিক্ষকদের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল প্রাইভেট টিউশনি। কিন্তু করোনার প্রভাবে সেই প্রাইভেটও বন্ধ। এমন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বৈষম্যের মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ^ শিক্ষক দিবস।

দেশে প্রায় ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছয় লাখ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাড়িতে চলে। আর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ নির্ভরশীল। টিউশন ফির টাকায় বাড়িভাড়া, বিভিন্ন ধরনের বিল ও শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের সন্তানরা পড়ালেখা করায় তারা স্কুল বন্ধের সময়ে কেউ বেতন দিতে পারছেন না, আবার কেউ দিতেও চাচ্ছেন না। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন এসব স্কুলের শিক্ষকরা।

রাজধানী ও আশপাশের অনেক স্কুল মহামারির কারণে কঠিন সময় পার করছে। এসব স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন এবং আর্থিক সমস্যায় দিন পার করছেন। এ খাতে জড়িতরা বলছেন, গত কয়েক মাসে শতাধিক স্কুল বিক্রি করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

সাভারের বাইপাইল এলাকার সৃজন সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজও তার মধ্যে একটি। এখানে আছেন প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ১৫ জন শিক্ষক। স্কুলটির চেয়ারম্যান শামীম ইকবাল বলেন, আমি এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।

আমার শিক্ষার্থীদের কথা ভাবলে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু আমি আর কী করতে পারি? এ স্কুল চালানোর জন্য আমার মাসে এক লাখ টাকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি পাচ্ছি না একটি টাকাও।

বসিলা এলাকার রাজধানী আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ও রয়েছে বিক্রির তালিকায়। এর পরিচালক ফারুক হোসেন রিপন জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিতে ১৭০ জন শিক্ষার্থী এবং ১৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। তিনি বলেন, বাড়িভাড়া ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার বকেয়া আমাকে পরিশোধ করতে হবে। আবার বেতন-ভাতা নিয়ে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে শিক্ষা পেশায়।

সরকারি প্রাথমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। আর পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভারত ও পাকিস্তান এমনকি নেপালের চেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবস্থা আরও করুণ। এসব প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতার কোনো নীতিমালা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে ঠকছেন শিক্ষকরা। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের একজন শিক্ষক বেতন পান মাত্র ৫শ টাকা।

ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় এক হাজার টাকা। মাধ্যমিক স্কুলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে মূল বেতন পেলেও নন-এমপিও শিক্ষকরা বিনা বেতনে এই পেশায় আছেন বছরের পর বছর। বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের অবস্থা আরও খারাপ। অনার্স-মাস্টার্স কোর্সেও শিক্ষকদের এমপিও দেয় না সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই এমপিওর দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। এ ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় পার্টটাইম শিক্ষকদের দিয়ে চলছে।

সেখানকার নিয়মিত শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নেই। এই করোনাকালে করুণ অবস্থায় জীবনযাপন করছেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ৪ হাজার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ হাজার শিক্ষক থাকলেও বাস্তবে মাদ্রাসার সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকা ও সহকারী শিক্ষকদের ২৩০০ টাকা ভাতা দেয় সরকার। তবে চলতি অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ও বরাদ্দ থাকলেও কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

দেশে এখন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। বড় বিশ^বিদ্যালয়গুলো নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করলেও সমস্যায় আছে ছোট ও মাঝারি বিশ^বিদ্যালগুলো।

প্রায় ৭৫টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।

বাংলাদেশ নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে এমনিতেই শিক্ষকরা তেমন বেতন পান না। বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রাইভেট টিউশনি করেন।

কিন্তু এখন সবই বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন আমার কাছে শত শত শিক্ষকের আক্ষেপ আর হা-হুতাশের খবর আসে। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। শর্ত শিথিল করে হলেও দ্রুততার সঙ্গে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তির দাবি জানাই।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহান পেশা ‘শিক্ষকতা’ এখন আকর্ষণহীন। বেতন বৈষম্যের কারণে মেধাবীরা এখন আর শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হন না। দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। তাই শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আফ্রিকার দরিদ্র দেশের চেয়েও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম বাংলাদেশে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কভুক্ত নেপাল ও ভুটানে যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশে বরাদ্দ বাজেটের মাত্র ১১ শতাংশ। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ (কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বরাদ্দ মিলে) আরও বেশি।

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে সচেষ্ট দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি হলো মালদ্বীপ। জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছে এ দেশ। প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের প্রায় ১২ লাখ শিক্ষক নানা সঙ্কট নিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের।