কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার ১৮ মাসের মাথায় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হচ্ছে সোমবার।

মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে শেষ হয়েছে মামলাটির বিচারিক কাজ। এ রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার আদালত চত্বরে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা।

এই মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে সিনহার পরিবার। অপরদিকে ন্যায়বিচার চেয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

২০২০ সালের জুলাই মাসে সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পট এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশের পাহাড় ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করতে এসেছিলেন।

এ সময় তার দুই সহযোগী সাহেদুল ইসলাম সিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথ সঙ্গে ছিলেন। এরই অংশ হিসেবে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া এলাকার মুইন্যা পাহাড়ের ভিডিও চিত্র ধারণ শেষে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে কক্সবাজার ফিরছিলেন।

৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর বাজারের কাছে এপিবিএন পুলিশ চেকপোস্টে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকতের গুলিতে নিহত হন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এই ঘটনার পর আটক করা হয়েছিল সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে। তল্লাশি চালানো হয় সিনহা যে হোটেলে থাকতেন সেখানে। ওই হোটেল থেকে আটক করা হয় অপর সহযোগী শিপ্রা দেবনাথকে। ঘটনাটি নিয়ে সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ওই সময়ে পুলিশ জানায়, সিনহা মেজর পরিচয় দিয়ে পুলিশের তল্লাশিতে বাধা দেন। পরে পিস্তল বের করলে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি এবং রামু থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে এসব মামলা দায়ের হয়।

টেকনাফ থানায় দায়ের করা দুই মামলায় নিহত সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়।

আর রামু থানায় মাদক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে আসামি করা হয় নিহত সিনহার অপর সফরসঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে।

ঘটনার চার দিন পর, ২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদি হয়ে ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতে মামলা করেন।

এতে প্রধান আসামি করা হয় টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে।

মামলার অন্য আসামিরা হল- টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত ও টুটুল, এএসআই লিটন মিয়া এবং কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও মোহাম্মদ মোস্তফা।

এই মামলার পরের দিন ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরও সাত জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।

২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র‍্যাব-১৩ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি পরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে থাকলেও টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক ছিল। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

সেই সাথে পুলিশের দায়ের তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সাইদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথকে মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করে আদালত।

২০২১ সালের ২৭ জুন আদালতে মামলার চার্জ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য দেন।

৯-১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করে।