আমার স্মৃতি কথা
শহীদুল ইসলাম

ছয়.
কলোনীর লোকজনের মুখে মুখে ইদানিং একটা কথা বেশ জোরে শোরে শোনা যাচ্ছে।

কথাটি হলো : আগে এসব জায়গায় কোনো মানুষের বসতি ছিলো না। এখানে নাকি ছিলো ভুত-পেতনীর বসবাস। বাঙালিরা এদের বসতি জবর দখল করে নিয়েছে। তাদেরকে তাদেরই পুর্বপুরুষদের বসতভুমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাই এরা বাঙালিদের উপর বেশ ক্ষুদ্ধ। আর সে জন্যে এরা ভয়ংকর রূপধরে এ এলাকার কাউকে কাউকে স্বপ্নে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং শীঘ্র এ এলাকা ছেড়ে দিতে হুমকি দিচ্ছে।। নাহয় এরা যখন তখন যে কাউকে খুন-খারাবি করবে বলে হুশিয়ারি দিচ্ছে। আর সেই জন্যে সন্ধ্যা বেলায় কখনো বা রাতের বেলায় কলোনীর বিভিন্ন প্রান্তে এ পেতনীরা ভয়ংকর ও বিভৎস আওয়াজ করছে যাতে মানুষের মনে ভয় ও ত্রাসের সৃষ্টি হয় এবং এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এলাকার অনেক মাই মুরব্বিরা নাকি এ বিভৎস আওয়াজ শুনেছেন। কলোনীর অনেকে বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছে। কারো হঠাৎ কলেরা বা ডায়রিয়া হচ্ছে । বহু ছেলেমেয়ে দাঁত মুখ খিছিয়ে হঠাৎ মারাও যাচ্ছে। মুরব্বিরা দাবি করছেন এসব ভুত-পেতনীদের কারসাজি ছাড়া আর কিছু নয়।

আমার দুই ভাই-বোন যারা মারা গেলো, তাদের মারা যাওয়ার পেছনে ভুত-পেতনীর আছর বলে অনেকে মনে করছে। মা’জান বললেন, তারা মারা যাওয়ার দু’দিন পুর্ব থেকে তাদের খিঁচুনি উঠেছিলো বারবার। তাদেরকে মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিলো যাতে ভুতপেতনীর নজর না পড়ে। ভুত-পেতনীরা নাকি জালকে ডরায়। তবুও তাদের বাঁচানো গেলো না।

ভুত-পেতনীর আছর থেকে রক্ষার জন্যে সন্ধ্যা নামার পর মা’য়েরা তাদের সন্তানদের ঘর-দোর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। ঘরের মুরব্বিরা শিশুদের ভুতপ্রেতের গল্প শুনিয়ে সন্ধ্যা ও রাতের বেলায় তাদের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখছে।

এমন এক অস্বাভাবিক অবস্থায় এলাকার মুরব্বিরা এবং মৌলবী-ইমামগণ এ থেকে বাঁচার উপায় খোঁজে বের করতে শলাপরামর্শ করলেন। শলাপরামর্শক্রমে তারা যে সব সিদ্ধান্ত নিলেন তা হলো –

• কলোনীর চার দিকে সীমারেখা চিহ্নিত করে ঝাঁড়ফুক করতে হবে।

• সীমানার চার কোণায় চারটা তাবিজ পুঁততে হবে এবং চারটা তাবিজ পোড়াতে হবে।

• প্রতিটি তাবিজ এবং খুঁটি পোঁতার সময় আজান দিতে হবে।

• চার কোণার সাদা কাপড়ে দোয়া দুরুদ লিখে তা খুঁটির মাথায় বেঁধে সীমারেখার বিভিন্ন স্থানে পুঁততে হবে।

• প্রতি বাড়ি থেকে মুড়িচাল তুলে ছিন্নি পাকিয়ে সকল ছেলেমেয়েকে খাওয়াতে হবে।

এভাবে ভুত-পেতনীর নজর থেকে এ এলাকাকে রক্ষা করতে হবে। এ এলাকা থেকে এদের স্থায়ীভাবে তাড়াতে হবে।

মানব আর দানব এখন পরস্প মুখোমুখি। উভয়ের জন্যে এটা অস্থিত্ব রক্ষার লড়াই। কে জিতবে এ লড়াইয়ে? বাঙালিরা অসীম সাহসী ও সংগ্রামী জাতি। তারা যেখানে শক্তিশালী ইংরেজদের তাড়িয়েছে, পাঠান-বিহারীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে সেখানে ভুত-পেতনী তাড়ানো তাদের জন্যে কোনো ব্যাপার হলো? দেখা যাক, সময়ই বলে দেবে কে হারে কে জিতে।

এখন অন্য এক প্রসঙ্গে আসা যাক, একদিনের ঘটনা। রাশেদ আর আমি আমাদের উঠোনে পিঁড়ি নিয়ে গাড়ি টানা খেলছিলাম। প্রথমে পিঁড়ির পায়ে একটা রশি বাঁধলাম। তারপর আমি পিঁড়িতে উঠে বসলাম। রাশেদ পিঁড়ি খানা টেনে উঠোনের চারপাশে এক বার ঘোরালো । এরপর আমার পালা। আমিও তাকে এক পাক ঘোরালাম। এভাবে খেলাটি চলছিলো। খানিক্ষণ পর রাশেদের মা’য়ের গলার আওয়াজ শোনা গেলো।
– রাশেদ, ও রাশেদ, কোথায় গেলি রে। আয় বাবা, নাওয়া খাওয়া কবে করবি রে? রাশেকে ডাকতে ডাকতে তিনি আমাদের উঠোন পর্যন্ত চলে আসলেন। মা’কে দেখে রাশেদ বলল, এই তো মা, আমি এখানে। ওর সাথে খেলছিলাম।
আমি বললাম, চাচী, আমরা আরও একটু খেলবো।
রাশেদ বলল, মা, আমি এখন ভাত খাবো না। পরে খাবো।
– আচ্ছা, দেরি করবি না কিন্তু।
এই কথা বলে তিনি আমার মা’কে ডাকতে ডাকতে ঘরের দিকে গেলেন।
– গুলোর মা, ও গুলোর মা, কি করছেন ?
– এই তো, মুরগির বাচ্চাগুলো কে একটু খাবার দিচ্ছিলাম।

আমাদের মুরগি অনেক গুলো বাচ্চা দিছে। মুরগির বাচ্চার সাথে দুটি হাঁসের বাচ্চাও। মা মুরগিটা অন্য বাচ্চাদের মতো হাঁসের বাচ্চাগুলোকেও বুকে নেয়,আদর করে,খাবার খাওয়ায়। হাঁসের বাচ্চাগুলো দেখতে খুব সুন্দর। তুলতুলে নরম, একেবারে তুলোর মতো। বাচ্চাগুলো আমার খুব প্রিয়। তাই আমি এদের আদর-যত্ন করতাম।

মা’য়ের সাথে কথা বলতে বলতে চাচী মুরগির বাচ্চাগুলোর দিকে যাচ্ছিলেন। বাচ্চাগুলো এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছিলো। হঠাৎ হাঁসের বাচ্চা একটা চাচীর পায়ের নিচে পড়ে পিষ্ট হয়ে যায়। পায়ের চাপে বাচ্চাটার নাড়িভূঁড়ি বের হয়ে যায়। চটফট করতে করতে বাচ্চাটি আমার চোখের সামনে মারা গেলো। তা দেখে আমি মনে খুব কষ্ট পেলাম। আমার যে কান্না! মা বলছেন, তোমার চাচী তো দেখে নি। কী আর করা । চাচী বলছেন, ক্যাঁদো না বাবা, ভুল হয়ে গেছে। তোমাকে আর একটা হাঁসের বাচ্চা এনে দেবো।

না, কিছুতেই আমার কান্না থামছে না। অনেক্ষণ কান্না কাটি করলাম। কেঁদে কেঁদে মনের কষ্টটা কমানোর চেষ্টা করলাম। ছোট্ট নিরীহ প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ থেকে আমি খুব ব্যথিত হলাম। (ক্রমশ)

লেখক : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক