আমার স্মৃতি কথা
শহীদুল ইসলাম

চার.
বাঙালি কলোনীতে যেখানে আমাদের জন্য ঘর তৈরি হয়েছে সপ্তাহ খানিক হলো সেখানে উঠেছি । জায়গাটি করাচি বন্দর থেকে আনুমানিক ষাট সত্তর কিলো উত্তর-পুর্ব দিকে। এখানে সবাই বাঙালি, পুর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা। আমাদের আশে পাশে যারা আছেন, তারা সবাই টেকনাফ ও উখিয়ার । কেউ হয়তো দু’এক বছর আগে এসেছে,কেউ বা পরে। আমাদের প্লটখানা কলোনীর একেবারে দক্ষিণ-পুর্ব প্রান্তে। মেঝো জ্যাঠা’রা আমাদের পুর্ব পাশে আলাদা প্লটে ঘর করেছে।

সে যাহোক,সারা জীবনের পরিচিত ও অভ্যস্ত পরিবেশ ছেড়ে হঠাৎ এখানে এসে মা আর দাদী’মা কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। ফেলে আসা স্বজন ও দেশের জন্য ভীষণ মন জ্বলছে। তাই মা’জান কখনো কখনো ছেলে মেয়েদের জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছে। দাদী’মার চোখেও জল। আমি কিছু বুঝতে পারি না কেন তারা এমন করছে। তাই আমি তাদের দিকে ফেল ফেল চোখে তাকিয়ে থাকি। মা’জানকে জিজ্ঞেস করি, মা তোমার কী হয়েছে? কাঁদছো কেন? মা চুপ করে থাকেন আর আচঁল দিয়ে চোখ মুছেন। কিন্তু কিছু বলেন না। মা ও দাদী’মার এ অবস্থা সম্পর্কে বাপজি জানতে পারলে তিনিও হয়তো ঘাবড়ে যাবেন তাই তাকে কেউ কিছুই বুঝতে দেন না।

এদিকে মাস দেড় এক গত হলো। বাবা কাজ খুঁজচ্ছেন। হাতে টাকা পয়সা যা ছিলো তাও প্রায় শেষ। শীঘ্র কাজ কর্ম ধরতে না পারলে জীবন চালানো দায় হয়ে পড়বে। চেনা নেই,জানা নেই কোথায় কার কাছে যাবেন? এখানকার ভাষাও তেমন বুঝেন না, বলতেও তেমন পারেন না। কী করবেন কিছু ভেবে পাচ্ছেন না। তবুও তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন। একদিন মকবুল মামার সাথে এ বিষয়ে কথা বললেন। তিনি বললেন, চিন্তা করো না। কয়েক দিনের মধ্যে কোন একটা উপায় বের হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কয়েক দিন পর মকবুল মামা আমাদের বাসায় এলেন। বাবা বললেন, মকবুল কিছু একটা করতে পারলে? তিনি বললেন,কিছু তো একটা হবেই।শুনলাম, সদরে হাফিজ মিলে কিছু লোক নেবে। কালকে আমার সাথে যেতে হবে। মামা ও বাবা পরের দিন সকালের দিকে কাজের খোঁজে বের হয়ে গেলেন। বিকেলে দু’জন একসাথে ফিরলেন। বাবজি’র চোখে মুখে বিজয়ের হাসি দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় কোনো একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে হবে। মামা’ই আগে সুখবরটা শোনালেন, ” বুবু , শেষ পর্যন্ত হাফিজ মিলে বদ্দার চাকুরিটা হয়ে গেলো। বড় কাপড়ের মিল। ষোল হাজার লোক এক সাথে কাজ করে। দৈনিক আট ঘন্টা ডিউটি। বেতন মাসিক প্রথম প্রথম আশি রুপিয়া দেবে। ছ’ মাস পর হবে একশো । বেতনটা মন্দ না। ” এভাবে বাবা আপাতত চিন্তামুক্ত হলেন।

জ্যাঠা’জি কলোনীতে একটা মুদির দোকান শুরু করলেন।

এখানকার ভু-প্রকৃতি ও জলবায়ু সম্পর্কে একটু বলি। এটা আমাদের দেশের মতো না। এখানকার মাটি অতি রূক্ষ, কংকর,নুড়ি পাথর আর শিলা খন্ডের মিশ্রণে গঠিত। ভুত্বক কিঞ্চিত লোহিত ধূসর বর্ণের। যেদিকে চোখ যায় যেন দিগন্ত প্রসারিত কারবালা প্রান্তর, ধূ ধূ নির্জন মরুভুমি! কোথাও সমতল কোথাও বা উঁচু নিচু। কলোনীর দক্ষিণ পাশ দিয়ে পুর্ব-পশ্চিম বয়ে গেছে একটি মরা নদী। মরা নদী বললাম এজন্যে যে, এ নদীতে না আছে জল, না আছে স্রোত, না আছে কোন জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদ। সবুজ গাছপালাবিহীন বিস্তীূর্ণ মালভুমি । নেই কোথাও পাখপাখালির ডাকাডাকি। কদাচ চোখে পড়বে দু’একটা কাটাযুক্ত হরিদ্রাবর্ণের গুল্ম জাতীয় বৃক্ষ। বছরে কখনো দু’এক পশলা বৃষ্টি হলে ঢল নামে চতুর্দিকে। মরা নদীটা তখন হঠাৎ দৈত্যের মতো নৃত্য করে।দু’কূল চাপিয়ে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এখানে কখনো প্রচন্ড শীত,কখনো প্রচন্ড গরম। সব মিলে বিরাজ করছে একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। এমন একটা পরিবেশে বাঙালিদের কলোনী বসানো হয়।

ব্যবহারের ও পানীয় জলের জন্য কলোনীর দু’টি পয়েন্টে ওয়াসা’র পক্ষ থেকে অনেক লম্বা পানির গাড়ি (ট্যাংকার) প্রতিদিন একটা নির্ধারিত সময়ে এসে পানি দিয়ে যেতো । পাঁচ ছ’টা ট্রাক জোড়া দিলে যতটুক লম্বা হয় ঐ পানির ট্যাংকারগুলো কম পক্ষে অতটুকু লম্বা হবে। পানির গাড়ি আসার পুর্বে নির্দিষ্ট স্থানে সকলের নিজ নিজ জলপাত্র লাইন করে বসিয়ে রাখতে হতো । গাড়ির লোকেরা লাইনে লাইনে পানি দিয়ে যেতো। এভাবে প্রতিদিন সবাই পানি সংগ্রহ করতো । পানি সংগ্রহ করতো পুরুষ লোকেরা। জলপাত্র লাইন করা, কখনো জল সংগ্রহ নিয়ে মাঝে মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগে যেতো। এক দিনের ঘটনা। আমার বাবা পানি আনতে গেছে। কি একটা বিষয়ে প্রথমে কথা কাটাকাটি, তার পর হাতাহাতি। বাবার সাথে ঝগড়া হচ্ছে, এ কথা কার কাছ থেকে শুনতে পেয়ে আমার জ্যাঠা একটা লাঠি হাতে ঝড়ের বেগে অকোস্থলে ছোটে আসেন। তিনি ছিলেন খুব সাহসি। বাবার সাথে হাতাহাতি অবস্থায় দেখতে পেয়ে তিনি আর রাগ সামলাতে পারলেন না। তিন চার জন প্রতিপক্ষকে একাই তিনি ধরাশায়ী করে দিলেন। এভাবে তিনি প্রতিপক্ষের কবল থেকে বাবাকে রক্ষা করলেন। এটা পরে থানা পর্যন্ত গড়ায়। শুনেছি, মামলা হয়নি। তবে আহতদের চিকিৎসা বাবদ জ্যাঠা’জিকে পাঁচশ’ রুপিয়া জরিমানা গুণতে হয়েছিলো।

দেখতে দেখতে করাচিতে একবছর পার হলো। এ বছরটা ছিলো আমাদের জন্যে খুবই বেদনা ও শোকের বছর। আমার মেঝো বোন সোনা বাহার ও ছোট ভাই নাজির হোছন হঠাৎ কলেরায় আক্রান্ত হলো। তখন কলোনীতে এ রোগটা মহামারি রূপ নিয়েছে। অনেকে এ রোগে মারা যায়। চেষ্টা করেও আমার বোনটিকে বাঁচানো গেলো না। সে চলে গেলো না ফেরার দেশে। সন্তানের শোকে মা বাবাসহ সবাই মুহ্যমান। এমন অবস্থায় তিন দিন যেতে না যেতে আমার ছোট ভাইটিও আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যায়। তখন তার বয়স মাত্র দেড় বছর। মা’জান দুধের সন্তান হারিয়ে ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছেন। কে দেবে তাঁকে সান্তনা? বাবাও শোকে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। বাবার হাতে সন্তানের লাশ! এটা কত যে বেদনার তা কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না।
বাবা কয়েক দিন আর কাজে গেলেন না। মা’ সন্তানের শোকে মাঝে মাঝে পাগলের মতো হয়ে যেতেন।

আমার বয়স তখন তিনের কোটায়। আমাদের এক প্রতিবেশি ছিলো ঢাকাইয়া লোক। আমার সম বয়সি তাদের এক ছেলে ছিলো। নাম তার রাশেদ। আমার জ্যাঠার ছেলে কবির। বয়সে সে আমার চেয়ে সামান্য ছোট। আমরা তিন জন সারা দিন কখনো আমাদের উঠোনে, কখনো তাদের উঠোনে নানা রকম খেলাধোলায় মেতে থাকতাম। মার্বেল নিয়ে খেলা, কখনো বাসার পিঁড়ি নিয়ে গাড়ি গাড়ি খেলা,কখনো লুকোচুরি খেলা, কখনো বা বোচকা চোর, কখনো বা চোর-পুলিশ খেলতাম। বুবুও মাঝে মাঝে আমাদের সাথে খেলায় যোগ দিতো। ( ক্রমশ)