আমার স্মৃতি কথা
– শহীদুল ইসলাম

তিন.
মা’জানের মুখে শুনেছি – শৈশব কালের কিছু অংশ আমার কচুবনিয়া গ্রামে কেটেছে।

একদিন বাপ’জি মা’জানকে বললেন, তোমার মামাতো ভাই মকবুল কয় দিন আগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এলো। সে আদম বেপারির কাজ করে। মাস দু’এক পরে আবার চলে যাবে।বলছিলাম কি; ক্ষেত- খামারের কাজ আর ভালো লাগে না। পশ্চিম পাকিস্তানে নাকি জীবনযাত্রা অনেক সহজ। সেখানে এখানকার মতো ক্ষেত-খামারে

হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় না। কলকারখানাসহ মেলা কাজ আছে যেখান থেকে সহজে রোজগার করা যায়। অনেকে তাই সেখানে পাড়ি দিচ্ছে। দেশও দেখা হবে,ভাগ্যটাও বদলানোর চেষ্টা হবে। মকবুলের রাস্তাঘাট সব চেনা। আমরা সাথে যেতে চাইলে সে নিয়ে যাবে বলছে। টাকা-পয়সাও বেশি একটা দাবী করবে না। তাই আমরা তার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে পারলে ভালো হবে ভাবছি। তুমি কী বল? ‘আমি আর কী বলবো। তোমরা যা ভালো বোঝ তাই করো।’ — মা’জান জবাব দিলেন। মা’জানের জবাবটা যেন ‘ধরি মাছ না ছোঁই পানি’ ধরণের। বাপ’জি এ ব্যাপার নিয়ে দাদী’মা ও মকবুল জ্যাঠাজির সাথে কথা বলেন। তাঁরাও রাজি হলেন। তিনি তাই মনে মনে একটা পরিকল্পনা আঁটলেন। পরিবার পরিজন নিয়ে বিদেশ বিভূঁই যাবেন, অনেক অর্থ-কড়ি দরকার। কিন্তু হাতে তো টাকা-পয়সা জমা নেই! কী করবেন, চিন্তা করতে লাগলেন। শেষ মেষ উপায় একটা বের হলো। পানের বরজ ও ক্ষেত-খামার করার জন্যে আমাদের একটা খামার ভিটে ছিলো।

সেটা তিনি বন্ধক দেবেন। আবার দেশে ফিরে এলে বন্ধকিটা ছাড়িয়ে নেবেন। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় কালাবারো মো’হোছন (মোহাম্মদ হোছন) চাচা এটি বন্ধক নিতে রাজি হলেন। বসতভিটায় থাকলেন সেঝো জ্যাঠা ও তাঁর পরিবার। বাবা সেঝো জ্যাঠা থেকেও কিছু টাকা নিলেন। আর বাবার অংশের বসতভিটার সুপারি বাগান ভোগ-দখল করার জন্যে তাঁর জিম্মায় দিয়ে দিলেন। এ ভাবে টাকার ব্যবস্থা করলেন।

আমার জন্মের দ্বিতীয় বছরটা অনেক এ্যাডভেন্চারে ভরা। সময়টা হাল্কা গরম কাল। বাপ’জি সপরিবারে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি’র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। সঙ্গে দাদী’মা আছেন। জ্যাঠা’জিও সপরিবারে সফর সঙ্গী হলেন। আমার বড় বোনের বয়স তখন পাঁচ কি ছ’বছর। জানা নেই, শোনা নেই সম্পূর্ণ অচিন ও স্বপ্নের দেশ করাচি! সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা ভাব ও রোমাঞ্চকর অনুভুতি কাজ করছে। দাদী’মার কাছে শোনা – সেদিন সকাল বেলা আমরা আত্মীয় স্বজন সবার সাথে বিদায়ী সাক্ষাত করে বাড়ি থেকে রওয়ানা হই। গাড়ি ঘোড়ার কোনো বালাই নেই। প্রায় দুই আড়াই মাইল মতো পায়ে হেঁটে টেকনাফ বাজার স্টীমার ঘাটে হাজির হলাম। আমি কিছুক্ষণ বাবা’র কোলে , আবার কিছুক্ষণ দাদী’মার কোলে চড়ে আসলাম। এদিকে মকবুল মামাও হাজির। তার সাথে আরো কয়েকজন লোকও সঙ্গী হয়েছে। টেকনাফ থেকে চাটগাঁ পর্যন্ত তখন স্টীমার সার্ভিস চালু ছিলো। আমাদের স্টীমার নাফ নদী হয়ে বঙ্গোপসার দিয়ে চাটগাঁ’র দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা। স্টীমার তখন কুতুবদিয়া বাতিঘর বরাবর পৌঁছলো। আমরা চাটগাঁ যখন পৌঁছি তখন প্রায় মধ্যরাত। বাকি রাতটা স্টীমারেই কাটালাম। চাটগাঁ পুর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম আন্তজাতিক সমুদ্র বন্দর। ইংরেজরা চাটগাঁ বা চাটগাঁও কে বলে চিটাগাং। অবশ্য স্থানীয়রা কেউ কেউ এখনো চাটগাঁ-ই বলে থাকেন। চাটগাঁ থেকে সরাসরি পাকিস্তানের রাজধানী করাচি সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত জলপথে জাহাজ সার্ভিস চালু রয়েছে। পরের দিন ‘সকিনা আরব’ নামে একটি জাহাজে টিকেট বুকিং নেওয়া হলো। জাহাজ রাত আটটায় বন্দর ত্যাগ করবে। তাই সন্ধ্যা নাগাদ আমরা জাহাজের নির্ধারিত কেবিনে ওঠে পড়ি। বিকট ভেঁপু বাজিয়ে সকিনা আরব যথাসময়ে বন্দর ত্যাগ করলো। তিন তলা বিশিষ্ট বিশাল জাহাজটি বঙ্গোপসাগরের গভীর জলরাশির বুক চিরে শত শত যাত্রী নিয়ে করাচি অভিমুখে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল। তিন দিন পর এটি শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে ভীড়ে। জ্বালানি নেয়া ও যাত্রী উঠা-নামার জন্যে জাহাজটি একদিনের যাত্রা বিরতির পর বন্দর ত্যাগ করে। এবার আমাদের জাহাজ আরব সাগর হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তিন দিন পর এটি ভারতের মুম্বাই বন্দরে একদিনের যাত্রা বিরতি করে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ ও যাত্রী উঠা-নামার পর সকিনা করাচি বন্দরের উদ্দেশ্যে পুনরায় রওনা দেয়। আরো তিন দিন চালানোর পর জাহাজটি সকাল বেলা নির্ধারিত গন্তব্য করাচি বন্দরে পৌঁছে। জাহাজ থেকে নেমে আমাদের কে করাচি শহরের ‘সোসাইটি’ নামক একটা বাঙালি কলোনীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলের মতো একটা দালানে কয়েক দিন কাটালাম। ইতিমধ্যে সোসাইটিতে আমাদের জন্য প্লট কিনে সেখানে চাটাইয়ের মতো বস্তু দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়। সপ্তাহখানেক সময় বাদে আমরা সেই ঘরে উঠি।

শৈশবকালের এমন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা জীবনে আজো দ্বিতীয়বারটি হয়ে উঠেনি। একমাত্র বাপজি’র একান্ত ইচ্ছার কারনে সেটা সম্ভব হয়েছে। তাই তাঁর প্রতি আজো মনে গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগে। (ক্রমশ)