আমার স্মৃতি কথা
– শহীদুল ইসলাম

নয়.
মৌলবী আলী হোছন হুজুরের মক্তবে বুবু ইতিমধ্যে কায়দা ও আম ছিপারার পাঠ সমাপ্ত করেছে। কোরআন শরীফের নাজেরা পাঠ শুরু করবে। এই জন্য হুজুরকে দাওয়াত খাওয়ানো হলো। মক্তবের সকল শিক্ষার্থীকে খই বা মুড়ি খাওয়ানোর পর যথানিয়মে পাঠ শুরু হলো। মৌলবী চাচার মক্তবে আমারও আরবী পাঠের হাতেখড়ি হলো। এখন আমি বুবু’র মক্তবের নিয়মিত সঙ্গী হয়ে গেলাম।

দেখতে দেখতে বছর শেষ হয়ে এলো। আমার কায়দার পাঠও সমাপ্ত হলো। পুরো কায়দা থেকে যথারীতি ইন্তেহান (মৌখিক পরীক্ষা) হলো। আমার সহপাঠী ছিলো আরও তিন জন। দুই মেয়ে এক ছেলে। মৌলবী চাচা ধরাজ গলায় বললেন, তোমরা চারজন আগামী কাল মক্তবে আসার সময় প্রত্যেকে মুড়ি বা খই আনবে। আর সাথে নতুন আমছিপারা নিয়ে আসবে যাতে নতুন পাঠ শুরু করতে পারি। বাড়ি ফিরে মা’কে সব বললাম। বিকেলে বাবা কাজ থেকে ফিরলে মা তাকে সব বললেন। তিনি খই আর ছিপারা কিনে আনলেন। আগামী কাল নতুন বই আর নতুন পাঠ! মনে অজানা এক শিহরণ ও উত্তেজনায় সে দিন রাতে আমার ঘুম হলো না। কখন রাত শেষে ভোর হবে,মক্তবে নতুন বইয়ের নতুন পাঠ শুরু করবো? পরের দিন। বুবু খইগুলো হাতে নিলো। আমি নতুন ছিপারা ও রিহাল বুকে নিয়ে মক্তবে রওনা দিলাম। গিয়ে দেখলাম আমার অন্য সহপাঠী’রাও সবাই উপস্থিত। তারা কেউ আনলো খই কেউ বা মুড়ি। হুজুর বড় দুই ছেলে মেয়ে দিয়ে সবার মধ্যে সেগুলো ভাগ দিলেন। সবাই বেশ মজা করে খইমুড়ি খেলো। হুজুরের জন্য একটি পুটলিতে মা’জান কিছু আখের গুড় ও দু’ই খিলি পান দিলেন। হুজুর আমাদের জন্য দো’য়া করে আমছিপারা’র পাঠ শুরু করে দিলেন।

কেন জানি না,সরকার সিদ্ধান্ত নিলো বাঙালি কলোনী এখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমাদেরকে স্থানান্তরিত করা হলো ‘অরঙ্গিটাউন’ নামের একটি জায়গায়। এটি করাচি সিটি’র উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটা এলাকা। নামে ‘টাউন’ হলেও এটি তখন মূলত আগের কলোনীর মতো নির্জন ও পরিত্যক্ত একটি জায়গা। নাগরিক জীবনের কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিলো না। আমাদের জন্য প্লট বরাদ্দ হলো ‘১৫/সি’তে। কতগুলো মহল্লা বা পাড়া নিয়ে এক একটা এলাকা। এলাকা ভিত্তিক এক একটা নাম্বার। যেমন আমাদের এলাকার নাম ১৫ নাম্বার। আবার এক একটা মহল্লার ভিন্ন ভিন্ন উপনাম। আমাদের মহল্লা হলো ১৫/সি।কোনোটা ১৫/বি,কোনোটা ১৫/এ আবার কোনোটা বা ১৫/ডি ইত্যাদি।

বাঙালিরা আবার জীবন-জীবিকার নতুন সংগ্রামে লিপ্ত হলো। তারা এখানে নিজেদের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে ঘর- বাড়ি,রাস্তা-ঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, হাট-বাজার ইত্যাদি গড়ে তুলল। আমাদের বাড়ির পাশেই তৈরি হলো মসজিদ ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। সেখানে আমাদের ভর্তি করে দেওয়া হলো।

আমাদের এক প্রতিবেশি হাকিম চাচা। তিনি বাবার বন্ধু। তাঁরা একই মিলে কাজ করেন। অবসর সময়ে তাঁরা প্রায়শই নানা বিষয়ে গল্প গুজব করতেন। বাবার মুখে শুনেছি, তাদের দেশের বাড়ি হিমছড়িতে। হাকিম চাচার এক ছেলে, নাম ছৈয়দুল্লাহ। সে আমার পড়ার সাথী। পড়াশোনার পাশাপাশি আমরা খেলাধূলা করে সময় কাটাতাম। ছৈয়দুল্লাহ’র বড় বোন ফাতেমা। আমরা তাকে বুবু ডাকতাম। সে আমাদের খুব স্নেহ করতো। এক দিন শুনলাম, ফাতেমা বুবু’র বিয়ে হচ্ছ। বিয়েতে অনেক আনন্দ করলাম। ফাতেমা বুবু’র বর আমানুল্লাহ। সে পুর্ব পাকিস্তান থেকে একাকী এখানে এসেছে। তাই সে হাকিম চাচা’র ঘর জামাই হলো। চাচা তাকে তাদের প্লটের এক পাশে একটা ঘর করে দিলেন। সেখানে ফাতেমা বুবু ও আমানুল্লাহ দুলাভাই বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছেন। আমানুল্লাহ’র দেশের বাড়ি কক্সবাজারের আলীর জাঁহাল এলাকায়।

সে যাহোক বাবা মাহিনা থেকে এবার নতুন একটি মাল্টিব্যান্ড রেডিও কিনে আনলেন। হাকিম চাচা ও বাবা প্রতিদিন রাতে অনেক্ষণ খবরাখবর শুনতেন। বিবিসি থেকে প্রতিদিন দেশের তাজা খবর শোনা যেতো। বাবা মাঝে মধ্যে আমাদের কাছেও খবরের চৌম্বক অংশগুলো বেশ উৎফুুল্লের সাথে বর্ণনা করতেন। একদিন বাবা বললেন, দেশে (পুর্ব পাকিস্তান) ভয়াবাহ ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বয়ে গেছে। এতে কয়েক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে আছে তারা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ঘূর্ণিঝড় কবলিত এলাকার জন্য এখানে বাঙালি কলোনীতে প্রতি মহল্লায় ত্রান কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ঘরে ঘরে গিয়ে নগদ অর্থ ও পুরাতন বস্ত্র সংগ্রহ করে দেশে পাঠিয়ে দেয়। আমরা খবর পেয়েছি যে, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে নিহতদের জন্য অনেকের দাফনের জন্য কাফনের কাপড় পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ফলে অনেক কে কাপড়ের অভাবে বিনা কাফনে অথবা লতা-পাতা মুড়িয়ে দাফন করা হয়। যারা কোনো মতে প্রাণে বেঁচে গেছে তারা অন্ন-বস্ত্র- বাসস্থান সংকটে পতিত হয়। এসব শুনে সবাই খুব মর্মাহত হলেন। তাই এখান থেকে যে যার সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা পাঠালেন।

সমগ্র পাকিস্তানে তখন জাতীয় নির্বাচনের গরম হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। পুর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছেন। তাই এখানে তিনি বাঙালিদের হৃদয়ের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে অধিষ্ঠিত। পশ্চিম পাকিস্তানের অরঙ্গিটাউনসহ হায়দ্রাবাদ,সবজিমন্ডি ও টিনাটিতে প্রধানত বাঙালিদের বসবাস। এখানে তাদের সংখ্যা চার লক্ষাধিক। বাঙালি কলোনীগুলোতে দোকানপাটে, চায়ের দোকানে, অলিগলিতে তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন রকমের বাধাঁনো ছবি ও পোস্টার শোভা পাচ্ছে। ভরাট মুখাবয়বে কালো ফ্র্যামের স্বচ্ছ চশমা,বাবরি কাটা চুল, কালো রঙের ব্লেজার পরা কোথাও বা বাঙালিআনা শাল পরিহিত ছবির মানুষটি হচ্ছেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। পশ্চিম পাকিস্তানে বসে ছোটবেলায় এই প্রথম কোনো বাঙালি জাতির জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার ছবি দেখলাম। বাবা, চাচা ও জ্যাঠারা তাদের প্রিয় নেতাকে ” শেখ সাহেব ” বলে সম্বোধন
করতেন।

পুর্ব পাকিস্তানে ন্যাশনাল এ্যাসেমব্লি ও লোয়ার এ্যাসেমব্লিতে প্রায় সবগুলো আসনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ জয় লাভ করেছে। আমাদের কক্সবাজার আসন থেকে এড. নুর আহমদ ন্যাশনাল এ্যাসেমব্লি মেম্বার (এমএনএ) নির্বাচিত হন। যিনি আমাদেরই টেকনাফ কচুবনিয়া গ্রামের সন্তান। তিনি আমাদের নিকট আত্মীয়। বাবার ভাষায়, “আমাদের গ্রাম থেকে আমার ভাই নুর আহমদ উকিল রাজা (এমএনএ) নির্বাচিত হয়েছে।” বাবা গর্ব করে বলতেন,” আমরা রাজার এলাকার বাসিন্দা।”

নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় আওয়ামী লীগের জন্য যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো। আর বিবিসি’র বস্তুনিষ্ঠ সংবাদে শাসকগোষ্ঠী খুবই রুষ্ট। তাছাড়া তারা বাঙালিদের সব সময় সন্দেহের চোখে দেখতো। সে জন্য আওয়ামী লীগ ও বিবিসি’র নাম উচ্চারণ করা তখন রীতিমতো এখানে নিষিদ্ধ ছিলো। বাঙালিরা তাই গোপনে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচার করতো। বাবা অত্যন্ত গোপনে বিবিসি বাংলা সংবাদ শুনতেন।