আমার স্মৃতি কথা
-শহীদুল ইসলাম

সাত.
দেখতে দেখতে তিন পেরিয়ে চার-এর কোটায় পা দিলাম। বাবার কটন মিলের চাকুরিটা মোটামুটি ভালই চলছে। সংসারটা কায় ক্লেশে কোনোভাবে চলে যাচ্ছে। বাবা সময় মতো প্রতিদিন কটন মিলে কাজে যান আর বিকেলে ফিরেন। মাঝে মাঝে আমাদের জন্যে হাতে করে কিছু নাস্তা আনতেন , কখনো বাতাসা, কখনো বাদাম ভাজা, কখনো বা মিঠাই আনতেন। বাবার মিলটা দেখতে আমার খুব ইচ্ছে হলো।

কিন্তু বাবাকে বলার সাহস নেই। তাঁকে ভয় করে। তাই মা’কে বললাম,
– মা, ওমা, বাবা কাজ করে যে কী মিলে?
– কাপড়ের মিল।
– সেটা একবার দেখতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। বাবা কি আমাকে সঙ্গে নেবে?
– তুই সেখানে করবি কী?
– দেখবো।
– কী দেখবি?
– দেখবো, বাবা কীভাবে কাজ করে।
– তুই তো এখনো অনেক ছোট। তোমার বাবা সকাল থেকে বিকেল অবধি কাজ করবে।ততক্ষণ পর্যন্ত তুই সেখানে কেমনে থাকবি?
– থাকতে পারবো।
– পারবি না।
– মা আমি পারবো।
– পারবি না বললাম।
– আমি যাবো।
– তোর বাবা নেবে না তোকে।
– তুমি বাবাকে বলো।
– রাজি হবে না। অনেক দূরের পথ,কয়েকটা গাড়ি বদল করতে হয়,কারখানায় সারাদিন থাকতে হবে। বেশি বললে আমাকে বকবে।
আমি মিল দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। মা যখন রাজি হলেন না।,তাই মনে মনে ঠিক করলাম, পরের দিন বাবা যখন কাজে রওনা হবেন, একটু পরে চুপে চুপে আমিও বাবার পিছু ধরবো। অনেক দূর গিয়ে যখন আমাকে দেখবে, তখন আমাকে আর সঙ্গে না নিয়ে আর পারবে না। এ হলো আমার নিজস্ব চিন্তা। পরদিন বাবা যথাসময়ে কাজে রওনা দিলেন। গাড়ির স্টোপেজ একটু দূর আছে। সে পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। আমি আড়াল থেকে সব নজরে রাখলাম। মা’কে কিছু বললাম না। বুবুও মক্তবে গেছে। একটু পরে বাবাকে অনুসরন করলাম। আমি ছিলাম নগ্ন গায়ে, উদোম পায়ে। একটু ভয় ভয় লাগছে। নির্জন খোলা প্রান্তর। এর উপর দিয়েই চলাচলের পাথুরে পথ। ক্ষীণ পদক্ষেপে এগোতে লাগলাম। বাবা অনেক দূর এগিয়ে। কী জন্যে কে জানে, বাবা পেছন দিকে ফিরলেন, আমাকে দেখে খানিকটা বিস্মিত হলেন। সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে পেছন দিকে আসতে লাগলেন। একেবারে আমার নিকটে এলেন। আমার একটু ভয় লাগছে। তবুও দাড়িঁয়ে থাকলাম। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন,
– তুমি কোথায় যাচ্ছো?
– আমি নিরব ।
– কথা বলছো না কেন?
কী বলবো বুঝতে পারছি না। আবার মাইরের ভয়ও লাগছে। তাই নিশ্চুপ থাকলাম।
বাবা আমাকে এক হাতে ধরে অনেকটা টেনে হেঁচড়ে বাড়ির দিকে নিয়ে চললেন এবং রাগতঃ স্বরে বলতে লাগলেন,
– আয় ঘরে, আজ মজা দেখাচ্ছি।
বাবাকে ভীষণ ভয় করছে । আজ বুঝি রক্ষা নেই। বড় অপরাধ হয়ে গেছে। আল্লাহ জানে, কী রকম শাস্তি হয়! ভয়ে একেবারে জড়সড় হয়ে গেছি।
বাড়ি ফিরে বাবা কিন্তু আমাকে আর কিছু বললেন না। মা’কে বকাঝকা শুরু করলেন। বললেন,
– ঘরে বসে বসে কি করো? ছেলেটাকে সামলাতে পারো না?
– ছেলেটা তোমার কী করলো?
– তোমার ছেলে আজ আমার কাজে যাওয়াটা ভন্ডুল করে দিলো।
– কী হয়েছে?
– বাস স্টপ কাছাকাছি সে আমার পেছনে পেছনে চলে গেছে। সেটা তো আর আমি জানি না। কী একটা শব্দ শুনে পেছন ফিরে দেখি তোমার ছেলে দাড়িঁয়ে। আর গাড়িতে উঠা হলো না। কাজেও যাওয়া হলো না।তোমার ছেলেকে সামলাও।
– এই কথা? আচ্ছা দাঁড়াও। মিল দেখার মজা আজ দেখাচ্ছি।
মা তো রেগে মেগে আগুন। হাতে নিলেন একটা লাঠি আর বকাঝকা করছেন,
– আজ তুলাধুনা করবো। আর এরকম কোনো দিন যাবি?
– ওমা আর কোনো দিন যাবো না।
মা’য়ের হুমকি ধামকিতে আমার ভীষণ ভয় হলো। মারতে যাবে, তার আগেই আমি লাঠিটা ধরে ফেললাম এবং চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করি যেন কেউ আমাকে মা’য়ের কবল থেকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে।
– লাঠি ধরছ কেন? ছাড়,ছাড় বলছি।
– কোনো দিন আর যাবো না, মা।
আমার চেঁচামেচি শুনে দাদী’মা কোথা থেকে যেন দৌড়ে এলেন এবং আমাকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলছেন,
– হইছে হইছে, আর মারতে হবে না। আমার একটা মাত্র নাতি ভাইয়াকে তুমি এভাবে মারলে? তুমি তো ভালা মাইনসের মায়া না ইত্যাদি ইত্যাদি বকাবকি করতে লাগলেন। শেষমেষ দাদীমা’র হস্তক্ষেপে এভাবে সেদিনের মতো বেঁচে গেলাম। কিন্তু মিল দেখার,শহর দেখার সাধ আমার মিটলো না। আশা পুরণ হলো না। তবে হাল ছাড়ি নি।

মেঝো জ্যাঠা’জি আমাকে ছোট বেলা থেকে খুব স্নেহ করতেন। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে,তিনি কলোনীতে একটা মুদির দোকান করতেন। দোকানের মালামাল কেনার জন্যে তিনি প্রায়শই শহরে যাতায়াত করতেন। একদিন শুনলাম,জ্যাঠা’জি শহরে যাচ্ছেন। সেদিন ঠিক কী কাজে তিনি শহরে যাচ্ছেন মনে নেই। জ্যাঠা’জিকে জিজ্ঞেস করলাম,
– জ্যাঠো,তুমি নাকি শহরে যাচ্ছো?
– হ্যাঁ,কেন বলতো? তুমিও যাবে নাকি?
– আমাকে নেবে জ্যাঠো?
– তোর যখন শহরে যেতে এত ইচ্ছা, যাবে তো চল। তবে আগে তোর মা’কে একটু বলে এসো।
– মা’কে আমি বললে যেতে দেবে না, জ্যাঠো।
– ঠিক আছে। তোর মা’কে আমিই বলবো।
জ্যাঠো মা’কে বলে রাজি করালেন। জামা কাপড় পরে তৈরি হলাম। কী আনন্দ! জ্যাঠো রওনা দিলেন। তাঁ’র সাথে সাথে হাঁটতে লাগলাম। অল্প দূরে বাস স্টপ।
স্টোপেজে গিয়ে আমরা একটা বাস গাড়িতে উঠলাম। জ্যাঠো আমাকে হাত ধরে উঠালেন। তিনি একটা সীটে বসলেন,পাশে আমাকেও বসালেন। বাস সময় মতো ছেড়ে দিলো। গাড়ি কিছু দুর গিয়ে একটু থামে,যাত্রী উঠা-নামার পর পুনরায় গন্তব্য অভিমুখে দ্রুত বেগে ছুটে চলে। একসাথে চারটি রোড সমান্তরাল ভাবে চলে গেছে, ওয়ানওয়ে রোড। রোডের পাশে কিছু দূর অন্তর অন্তর একটা একটা গাছ চোখে পড়ে। সড়ক কর্তৃপক্ষের অনেক পরিশ্রম ও যত্নের ফলে এগুলো হয়েছে। জ্যাঠো বললেন, এগুলো বাদাম গাছ। রোডের দু’পাশে সারি সারি সুরম্য দালান কোটা। গাড়ি চললে দালান-কোটা,মানুষ আর গাছগুলো পিছন দিকে দৌড়ায়। জ্যাঠো’কে জিজ্ঞেস করলাম,
– জ্যাঠো, দালানগুলো ও গাছগুলো এভাবে দৌড়াচ্ছে কেন?
– আসলে দৌড়াচ্ছে গাড়ি, গাছ ও দালানগুলো নয়। গাড়ি দৌড়ালে এমনটি হয়,বুঝলে?
– আমি না বুঝলেও মাথা নাড়লাম। সন্ধ্যের আগেই গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছলে আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। জ্যাঠো আমাকে এক হাতে ধরলেন এবং বললেন, এখন আমাদের রাস্তার ঐ পাশে যেতে হবে। সাবধানে রাস্তা পার হতে হবে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, দ্রুত রাস্তা পার হওয়ার সময় দুর্ভাগ্যবশ জ্যাঠোর হাত থেকে আমার হাত ছোঁটে যায়। তিনি ঐপাশে চলে যান কিন্তু আমি যেতে পারলাম না। এখন কি করতে হবে ঠিক কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই জ্যাঠো’র দিকে দৌড় দিতে চেষ্টা করলাম। এর পরে আমি আর কিছুই বলতে পারি না। পরে জ্যাঠো’র কাছে শুনেছি, ঐ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটা প্রাইভেট কার চোখের পলকে আমাকে ধাক্কা দেয়, আমি ছিটকে পড়ে যায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কারটি থামলো, পেছনে এসে আমাকে ও জ্যাঠে’কে গাড়িতে তুলে একটা হাসপাতালে নিয়ে যায়। কার মালিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। প্রায় তিন চার ঘন্টা পরে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। তখন আমি একটা বিছানায় শোয়া। রাত কয়টা বাজে জানি না। আমি বললাম,
– জ্যাঠো, আমি কোথায়? আমি এখানে কেনো? আমি ঘরে যাবো,জ্যাঠো।
– হ্যাঁ বাবা, একটু পরে চলে যাচ্ছি।
শুনলাম, কার মালিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন,ঔষধপত্র কিনে দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে খরচের জন্যে নগদ কিছু টাকাও জ্যাঠো’কে দিয়েছিলেন।
জ্যাঠোর কাধে চড়ে আমি ঘরে আসি। মা’ আমার অবস্থা দেখে কান্না জুড়ে বসে। জ্যাঠো ঘটনা সব বাবা মা’কে বলেন। দেখলাম আমার কপালে লম্বা সেলাই করা,হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ। ব্যথার জন্যে হাঁটা-চলা করতে পারছিনা। পুরোপুরি সেরে উঠতে মাস দেড়এক লেগে যায়। আমার দেহে এখনো সেই ছোটকালের ক্ষতচিহ্ন সাক্ষী হয়ে আছে।

শৈশব কালে শহর দেখতে গিয়ে এভাবে দুর্ঘটনা কবলিত মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা আমি আজও ভুলি নি।

লেখক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক