আমার স্মৃতি কথা

শহীদুল ইসলাম

আট.
ইতিমধ্যে করাচিতে আমাদের বসবাস দু’বছর পূর্ণ হয়ে গেলো। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিকে করাচি ছিল নিখিল পাকিস্তানের রাজধানী। পাকিস্তানের সাবেক এ রাজধানী করাচি অনেক বড় শহর, লন্ডনের মতো মেগা সিটি বলা যায়। স্থানীয় নেটিভরা করাচির প্রশাসনিক, বানিজ্যিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক এলাকাগুলোতে বাস করতেন। বাকি এলাকাগুলোর কিছু অংশ ছিলো তাদের হয় খামার এলাকা নয়তো চারণ ভুমি। অন্য অঞ্চলগুলো ছিলো জনশূন্য পরিতক্ত এলাকা। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান একদেশ হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের অনেকে বানিজ্যিক ও প্রশাসনিক কারনে পূর্ব পাকিস্তানে তথা প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন শিক্ষিত ও বিত্তবান। তারা বাঙালি থেকে আলাদা কলোনীতে থাকতেন।

অনুরূপভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বল্প সংখ্যক লোক পেশাগত কারনে পশ্চিম পাকিস্তানে গেলেও অধিকাংশ বাঙালি গিয়েছিলেন তাদের রুটি-রুজির সন্ধানে। তাদের অধিকাংশই ছিলেন দরিদ্র শ্রেণির। জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তারা সেখানে গিয়ে ছিলেন। পাঠান-বিহারিরা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র প্রশাসনিক ও বানিজ্যিক এলাকাগুলোতে বসবাস করার সুযোগ পেলেও বাঙালিদের কলোনী স্থাপনের জন্যে দেওয়া হয় সিটি থেকে অনেক দূরে নির্জন ও পরিতক্ত এলাকায় যেখানে নাগরিক জীবনের নূ্্যনতম সুযোগ-সুবিধা পর্যন্ত নেই । না আছে বিদ্যুৎ,গ্যাস, ডাক,টেলিগ্রাফ-টেলিফোন, না আছে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, না আছে সড়ক-নর্দমা,না আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,ব্যাংক, হাসপাতাল। সরকারিভাবে শুধু পানীয় জল সরবরাহের জন্যে পানির ট্যাংকার ও শৌচবর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য বর্জ্যবাহী গাড়ির ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই ছিলনা । ফলে এখানে বাঙালিদের অবহেলিত ও অনুন্নত জীবন যাপন করতে হয়। বাঙালিরা নিজ উদ্যোগে মহল্লায় মহল্লায় মক্তব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় শিক্ষার নূ্্যনতম ব্যবস্থাটুকু তারা করেছেন। হাতে গুণা দু’এক জন যারা একটু সচেতন তারা কেউ কেউ তাদের সন্তানদের শহরের উর্দু ইসকুলে পড়াশোনা করাতেন।

চিরচেনা অভ্যস্ত পরিবেশ ফেলে কৌতুহলবশতঃ এখানে এসে অল্প দিনের মধ্যে বাঙালিদের মোহ ভঙ্গ হয়। কেউ কেউ তাই স্বদেশে চলে যান। আমার দাদী’মা প্রথম থেকে এখানে মন বসাতে পারেন নি। আমার মা’জানেরও একই অবস্থা। কিন্তু তিনি তো আর স্বামী-সন্তান ত্যাগ চলে যেতে পারেন না। তাই তাঁকে অগত্যা মেনে নিতে হয়। আমার আদম বেপারি মকবুল মামা কয়েক দিনের মধ্যে আবার দেশে চলে যাচ্ছেন। বাবা দাদী’মাকে তাই তার সঙ্গে দেশে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।

পাঠক, এবার অন্য এক প্রসঙ্গে আসা যাক। আমার সড়ক দুর্ঘটনার জখমটা পুরোপুরি সেরে উঠতে কয়েক মাস লেগে যায়। মা একদিন বাবা’কে বললেন,
– শুনছো, এবার নাহয় ছেলেটার মুসলমানির দায়িত্বটা সেরে ফেল না।
– হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি। একজন অভিজ্ঞ হাজাম (যারা খৎনা করে) পাওয়া যায় কিনা দেখি।
হাজামরা এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে ঘুরে মুসলমানি করান। এভাবে তারা রুজি রোজগার করেন।
– ওর জ্যাঠী’মা বলল, সামনের রোববার তাদের কবিরের মুসলমানির জন্য একজন হাজাম আসবে। তাকে বলে রাখতে হবে।
– তাহলে তো ভালই হলো। তোমার ছেলের কাজটাও সেরে নেওয়া যাবে।
– কথা পাকাপাকি করে নাও তাহলে।
বাবা জ্যাঠো’র সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে আমার মুসলমানির দিনও ঠিক করে নিলেন। বাবা’কে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,
– বা’জান মুসলমানি কী?
– ছেলেদের নুনু’র মাথায় বাড়তি চামড়া থাকে।সেটা কেটে নিয়ে ফেলা’কে মুসলমানি বা খৎনা বলে।
– খৎনা কেন করতে হয়?
– এতে অনেক উপকার আছে। নানা অসুখ-বিসুখ থেকে বাঁচা যায়। তা ছাড়া এটা নবীর সুন্নত।
– আমার ডর লাগতেছে বা’জান।
– আরে ডরের কিছু নেই। তুই টেরও পাবি না। এই যা তোর নুনু’র মাথায় একটা পিঁপড়া কামড়াইলো আর কি।
– বুবু’র মুসলমানি হবে না?
– না। মেয়েদের হয় না।

রোববার দুপুরবেলা। আমাকে গোসল করানো হলো। একটা নতুন লুঙ্গি পরানো হলো। বুবু ঘন ঘন আমার দিকে তাকায়,আর মুচকি মুচকি হাসে আর বলে হুম,আজ কাটবো। আমার খুব লজ্জা লাগতেছে। আবার ভয়ও লাগতেছে।

বিকেলে হাজাম প্রথমে কবির কে মুসলমানি করান। মুসলমানি করার সময় কবিরের কান্না চেঁচামেচি ও চিৎকার শুনতে পেলাম। বা’জান অভয় দিলেও আমার ভয় কিন্তু কিছুতেই কাটছে না।

কিছুক্ষণের মধ্যে হাজাম আমাদের এখানে হাজির। লম্বা চওড়া বিশাল দেহ, কুচকুচে কালো। বাবরি কাটা চুল, চুলে তেল লাগানো। কাঁধে আঁট সাঁট কাপড়ের একটা ঝুলি । ঝুলিতে নুনু কাটার সব যন্ত্রপাতি। মাথাটা হেলে দোলে দ্রুত গতিতে আমাদের এখানে এসে উপস্থিত হলো। হাজাম এসে পাটিতে বসলেন।

পাশের বাড়ির লোকজন,রাশেদ ও তার মা খবর পেয়ে মুসলমানি দেখার জন্য উপস্থিত। ভিতরের ঘর থেকে বা’জান আমাকে সামনের ঘরে নিয়ে এলেন। হাজাম আমাকে দেখে দু’পাটি দাঁত সব বের করে হাসতে লাগলেন। কাজ শেষে নগদ কামাই করে বিদায় হবেন তাই। আর এদিকে আমার অবস্থা গুরুচরণ। একটা কাঠের পিঁড়িতে আমাকে বসানো হলো। পেছনে মাথার দিকে একজনে হাত দু’টো ধরলো। চোখে কাপড়ের একটা পট্টি বাধা হলো। আর একজন পা দু’টা ফাঁক করে শক্ত করে চেপে ধরলো যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। যেন গরু-ছাগল কোরবানি করা হবে। আমি বুঝতে পারলাম কী হতে যাচ্ছে। হাজাম নুনুটা ধরলে আমি ভয়ে চিৎকার দিই। হাজাম বললেন, বাবা এখনো তো কিছু করি নাই। কাঁদিস না। নুনু’র মাথার চামড়াখানা কী দিয়ে যেন আটকে রাখা হয়েছে। হঠাৎ ক্যাচেৎ করে কেটে ফেললো। আমি খুব ব্যথা পেলাম। এরপর আবার কাটাকাটি। ভীষণ ব্যথা করছে। হাত পা নাড়তে পারছি না। আমাকে এবার একজনে কোলে করে ভিতরের ঘরে নিয়ে এলো। চিৎ করে শুয়ে দিলো।

পরের দিন।
ব্যথা আরও বেড়ে গেছে। যন্ত্রনায় চটপট করছি। গতকাল হাজাম হাতে তৈরি কী যেন কতগুলো পথ্য লোক্যালি লাগিয়ে এক পিচ কাপড় মুড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

পুরোপুরি সারিয়ে ওঠা পর্যন্ত কতগুলো বিধি নিষেধ মেনে চলতে হবে। গরম পানি খেতে হবে। ঠান্ডা পানির ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না। মা সব সময় যত্নের সাথে গরম পানি প্রস্তুত করে রাখতেন। কখনো ঠান্ডা পানি চোখেও দেখতে দিতেন না। গরম পানিতে কেমন যেন গন্ধ গন্ধ ভাব। খেতে মোটেই মন চায় না। গরম পানিতে বুকটা জ্বলে যায়। বুবু কে ফিস ফিস করে বলি একটু ঠান্ডা পানি দিতে। কিন্তু সে রাজি হয় না। কী নিষ্ঠুর পাষাণ সবাই! একদিন মা ঘরে নেই। কোথায় যেন গেছেন। বুবু কেও দেখছি না। এমন সুযোগ কি আর ছেড়ে দেওয়া যায়? পাক ঘরে আছে পানির মটকা, মটকার পানি কী শীতল! মটকা থেকে এক মগ ঠান্ডা পানি নিয়ে ডগ ডগ গিলে ফেললাম। আহা কী শান্তি! প্রাণটা একেবারে জুড়িয়ে গেলো। হাতে লোহার তৈরি একটি চুড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে জীন-ভুত কাছে না আসতে পারে। জীন ভুত’রা নাকি লোহাকে খুব ভয় পায়। ঘরের বাইরে গেলে একটা লৌহদন্ড হাতে রাখতে হবে। হাঁটা চলার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে মুরগির বিষ্ঠা কোনো অবস্থায় মাড়ানো বা ওভারটেক করা না হয়। খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাদ বিচার করে চলতে হবে। কাঁচা মাছ-মাংস, তরিতরকারি, টকজাতীয় ফল খাওয়া যাবে না। তেলবিহীন শুটকি ভাজা খেতে হবে।
কাটা অংশ না শুকানো পর্যন্ত এভাবে চলবে।

লেখক : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক