আমার স্মৃতি কথা
-শহীদুল ইসলাম

পাঁচ.
মা’জান একদিন বাবাকে বললেন, মেয়েটার যে পড়াশোনার বয়স হয়েছে, তাকে মাদরাসায় পাঠাতে হবে,সে খেয়াল তোমার আছে?
– আছে আছে। ভাবছি, কলোনীর মাদরাসাটি একটু দূরে। মেয়ে মানুষকে এত দূরে দেওয়া যাবে না। শুনেছি, আমাদের এলাকার (টেকনাফ নাজির পাড়া) মৌ.আলী হোছন বাসায় মক্তব শুরু করেছেন। অনেকে ছেলে মেয়েদের পড়াতে দিয়েছে। আমাদের বাসা থেকে তেমন একটা দূরেও না। পুতুনিকে তার কাছে পাঠালে মনে হয় ভালো হবে।
– মৌলবীর সাথে আগে কথা বলেন। প্রয়োজনে তাঁকে বাসায় একবার দাওয়াত করেন।
– ঠিক আছে।
বাবা তাই মৌ. আলী হোছন কে শুক্রবার বাসায় দাওয়াত করলেন।

ঐ দিন সন্ধ্যাে মৌলবী সাহেব আমাদের বাসায় আসলেন। তিনি আমাদের দূর সম্পর্কের চাচা হয়। বছর দেড় এক হবে তারা এখানে এসেছেন।

মৌলবী চাচা আসবেন, মকবুল মামাও। মা’জান তাই পিঠা বানালেন। দাদী’মাও পিঠা তৈরির কাজে ব্যস্ত। এটা ওটা নানা কাজে তিনি মা’কে সাহায্য করছেন। মা’ পিঠা বানাবেন, আনন্দ কি আর ধরে রাখা যায়? কিছুক্ষণ পর পর পাক ঘরের দিকে বুবু ও আমার যাতায়াত বেড়ে যায়। দেখ, মা’ কাজ করতে করতে ঘেমে গেছেন। আমাদের দিকে তাকানোর ফরসুৎ তাঁর নেই। শুধু বলেন, এটা ধরিস না, ওটাতে হাত দিস্ না। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে একটু গুড়,একটু নারকেল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। ওগুলো শেষ করে বিভিন্ন অযুহাতে আবার পাক ঘরে আসা যাওয়া।
– মা কী পিঠা বানাবেন?
– পাকন পিঠা।
তখনকার দিনে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠা। বিনি চালের গুঁড়ো,গুড়, কলা, নারকেল সাথে চিকন জিরা পানিতে মিশিয়ে তৈরি হয় কাঁই বা মন্ড। এগুলো ঘন্টা তিনেক মজানো হয়। এর পর ছোট ছোট কাঁইয়ের গুল্লাকে রুটির মতো চেপ্টা করে উনুনে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ডুবিয়ে এ পিঠা তৈরি করা হয়।

মৌলবী চাচা তো আগেই এসেছেন। একটু পরে মকবুল মামাও হাজির । বাবা বুবুকে বললেন,পুতুনি,যাও তো মা তোমার জ্যাঠা’জি কে একটু ডেকে নিয়ে এসো।
বুবু আমাকেও সাথে নিলো। দু’জনে গিয়ে জ্যাঠা’জিকে ডেকে নিয়ে আসলাম। তারপর মৌলবী চাচা,মকবুল মামা,জ্যাঠা’জি ও বাবা সবাই একসাথে চা-নাস্তা, খেতে বসলেন। খেতে খেতে দেশের ও এখানকার নানা বিষয়ে অনেক্ষণ গল্প গুজবও চলল।

শেষে বাবা বুবুকে কাছে ডাকলেন। মৌলবী চাচা কে বললেন, তোর এ ভাইজিকে তোমার মক্তবে পড়াতে হবে।
– ঠিক আছে। কাল থেকে পাঠিয়ে দেন। কোন সমস্যা হবে না।
বাবা ছদর থেকে বুবুর জন্যে একখানা ওড়না আর একখানা লাল ঘাগরা কিনে আনলেন। (এখানে রাজধানী শহরকে ‘ছদর’ বলে) পরের দিন বুবু যথাসময়ে তৈরি হলো। একটা ছিপারা, একটা রিহাল, যত্নের সাথে মোড়ানো একটা চটের বস্তা বুকে নিয়ে বাবার সাথে সাথে সে চললো মৌলবী চাচার মক্তবে।

বুবু’র মক্তব সম্পর্কে জানতে আমার ভীষণ কৌতুহল জাগলো। বাবা ও মা’য়ের মুখে মক্তবের কথা শুনে,মক্তবের হুজুরকে দাওয়াত খাওয়ানো, হুজুরের জন্যে মা’য়ের পিঠা বানানোর আয়োজন, মক্তবে যাবে তাই বুবুর জন্যে জামা- কাপড় কেনা এবং বুবুর মক্তবে যাওয়ার প্রস্তুতি ইত্যাদি দেখে মক্তব সম্পর্কে আমার মনে নানা চিন্তা-ভাবনা বুদ্ বুদ্ করছে। মক্তবটা কেমন, না জানি, সেখানে কী হয়। মক্তবে গেলে নতুন জামা পাওয়া যায় , এমন লোভও কম ছিলো না। তাই মা’কে বললাম,
– ওমা, বুবুর সাথে আমিও মক্তবে যাবো।
– বেশ,যাবে তো যাবি। কাল থেকে তোর বোনের সাথে যাবি।
বুবু’র সাথে মৌলবী চাচার মক্তবে যাবো তাই বুবু আমাকে একটা শট প্যান্ট ও একটা গেন্জি পরিয়ে দিলো। বুবু’র সাথে হেঁটেই গেলাম। আমাদের বাসার মতো একটা ঘর। বুবু এতে ঢোকে একটা স্থান দেখে চটের বস্তাটি বিছালো। পাশে আমাকেও বসতে দিলো।
বুবুকে জিজ্ঞেস করি, তুমি মক্তবে যাবে না? – এটাই তো মক্তব।
– মক্তব কই? এটা তো আমাদের ঘরের মতো।
– হ্যাঁ, মক্তবও ঘর। হুজুর যে ঘরে পড়ান সেটাকে মক্তব বলে।
বুবু ছিপারাটি খুলল। এটি রিহালের উপর রেখে মাথা দোলাতে দোলাতে গু গু করে কী যেন পড়তে লাগলো। এতক্ষণে আরো কয়েক জন ছোটছোট ছেলেমেয়ে মাথায় টুপি-ওড়না পরে, বুকে রিহাল-ছিপারা ধরে সজোরে সালাম দিতে দিতে মক্তবে হাজির হলো। তারাও জায়গা মতো পাটি বিছিয়ে বসে গেলো। একটু পর ভিতরের একটা রুম থেকে মৌলবী চাচা এলেন। সবাই তাঁকে সজোরে সালাম জানালো। ঘরের এক পাশে একটা ছোট পাটি, পাটির উপর ছোট একটা কাঠের ডেস্ক। এর পাশে কয়েকটি চিকন চিকন বেত। ডেস্কটি সম্মূখ করে মৌলবী চাচা বসলেন। এক এক করে ডাকছেন। আগের দিনের সবক যারা দিতে পারলো তাদেরকে নতুন সবক দিচ্ছেন। আর সবক যারা দিতে পারছে না তাদের কারো পিঠে পড়ছে চিকন বেতের বাড়ি, কারো বা কান ধরে উঠ্ বস্। বেতের বাড়ি যারা সইতে পারছে চুপচাপ হজম করে নিচ্ছে,যারা পারছে না হাউ মাউ কান্নাকাটি করছে। বেশি জোরে কান্না করলে আবার ধমক আছে। ভিতরের ঘরে মৌলবী চাচার বউ বাচ্চারা। বাচ্চা তো দেখি নি। হয়তো নেই। মৌলবী চাচার বউ অর্থাৎ চাচী নাকি হুজুর, মহিলা হুজুর। মাঝে মধ্যে চাচা হুজুর কোথাও কোনো কাজে গেলে চাচী হুজুরই পড়ান।

এক দিনের ঘটনা। বুবু’র সাথে আমিও মক্তবে গেছি। সে দিন চাচা হুজুর বাসায় নেই। চাচী হুজুরই পড়ালেন। তিনি সবাইকে সবক দিচ্ছেন আর নিচ্ছেন। ভিতরে রান্না বান্নার কাজও করছেন। তাই তিনি বুবুকে বললেন: গুলো, চুলার হাঁড়িটা নামিয়ে রেখে ভাতের হাঁড়িটা একটু তুলে দিয়ে আয় তো, মা।
বুবু পাক ঘরে গিয়ে তরকারির হাঁড়িটা কোনো মতে নামালো কিন্তু ভাতের হাঁড়ি তুলতে গিয়ে থামিতে যে আগুন লেগে যায় তা ও টের পায় নি। পরে থামিতে আগুন দেখে ও ভীষণ ভয় পেলো। তাই ও চিৎকার দিলো। তাড়াতাড়ি কাপড় খানা খুলে ফেলে দিলো। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ওর ঘাগরাতেও ধরলো। তাই সে আতংকে ছোটাছুটি করে পড়ার ঘরে এসে পড়ে। চিৎকার করতে করতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। চাচী তাড়াতাড়ি দু’একটা চটের বস্তা চাপা দিলো। ভাগ্যিস আগুন নিবে যায়। তবু হাতে পায়ে ওর কয়েক জায়গায় পুড়ে যায়। যাহোক,ছোট বেলায় আমার বোনটি ভাগ্যক্রমে এভাবে বড় দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায়। পুরোপুরি সারিয়ে উঠতে পনেরো বিশ দিন লেগে যায়।
পরবর্তীতে আর কখনো চাচী হুজুরকে এভাবে কাউকে কাজে খাটাতে দেখি নি। (ক্রমশ)