শিক্ষা বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই যা বিবেচ্য তা হলো, শিক্ষা কী ও কেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর যেমন জটিল, তেমনি সরলও বটে। জটিল তখনই যখন শিক্ষার সাথে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের মারপ্যাঁচ সংযোজিত হয়। শিক্ষা যখন সর্বজনীন স্বার্থে পরিচালিত হয় এবং মানুষের মানবিক গুণাবলি বিকাশের শর্ত বলে বিবেচিত হয় তখন শিক্ষার সরল রূপটি ধরা পড়ে। যেমন বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন : ‘A pacifist will not desire for his children the education which seems good to a militarist; the educational outlook of a communist will not be the same as that of an individualist’ (Bertrand Russell, On Education, Union Books, p.8). এই উক্তির মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষার যে বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে তাই বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে আমরা বুঝতে পারব যে, বস্তুত শিক্ষা মানুষের জন্য। এই পৃথিবী গ্রহে যত দিন মানুষের হৃৎস্পন্দন অনুভূত হবে, শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তত দিন থাকবে। তাই আমাদের বিবেচনায় যে বিষয়টি একান্তই জরুরি তা হচ্ছে, শিক্ষা মানুষের জন্য এমন একটি উপযোগ সম্পন্ন বিষয় যা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর এক উপযুক্ত হাতিয়ার। এই মৌলিক প্রয়োজনের বিবেচনায় পৃথিবীর মানুষ একে অপর থেকে অভিন্ন- একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; এক দেশেও নয়, বিভিন্ন দেশেও নয়। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের এই অভিন্নতাই মানুষে মানুষে ঐক্য স্থাপনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আর এই ঐক্য থেকেই আসে মানুষে মানুষে পরস্পর সম্পর্কে হৃদয়ানুভূতিজাত মানবিক দিকটি। আমার যদি আঙুল কেটে যায়, রক্ত ঝরে এবং ব্যথা অনুভব করি, তবে এ ব্যাপারটা অন্যের বেলায়ও যে সত্য এ কথা তখনই বুঝব যখন শিক্ষা আমাদের একজনকে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে না দেয়।

 

শিক্ষা ক্ষেত্রে উৎপাদন সম্পর্কজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ যেসব উপকরণ নিয়ে নিত্যদিনের কাজ সম্পন্ন করে তার সাথে সব মানুষের সম্পর্ক একই রকম হয় না। উৎপাদনের উপকরণের সাথে মানুষের সম্পর্ক নানা রকম। মোটা দাগে এর ভিত্তিতে মানুষকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়Ñ মালিক এবং মজুর। মজুর শ্রম বিক্রি করে এবং উৎপাদনের উপকরণের মালিক তা মজুরির বিনিময়ে ক্রয় করে। উৎপাদনের উপকরণের সাথে মানুষের এ সম্পর্কের বিভিন্নতার কারণে এবং এই সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শ্রেণী-গোষ্ঠীর তুলনামূলক শক্তি ও ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতাকে ধরে রাখার লক্ষ্যে শিক্ষার সংজ্ঞায় জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। এ কথা খুবই সত্য যে, উৎপাদনের উপকরণের ওপর মালিকানা থাকা ও না থাকার ভিত্তিতে পৃথিবীর জনগোষ্ঠী পরিষ্কার দুটি শিবিরে বিভক্ত। এক ভাগে আছে উৎপাদনের উপকরণের মালিক সম্প্রদায় এবং অপর ভাগে আছে ওই সব উৎপাদনের উপকরণ নিয়ে যারা পণ্য উৎপাদন করে তারা অর্থাৎ যারা শ্রম বিক্রি করে। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে চলে নিরন্তর সঙ্ঘাত।

উৎপাদনের উপকরণের সাথে পরস্পর বিপরীত সম্পর্কযুক্ত এই দুই শ্রেণীর মধ্যে সঙ্ঘাত শুধু উৎপন্ন পণ্যের ভাগবাটোয়ারা নিয়েই নয়; বরং ওই সব উৎপাদনের উপকরণের ও পণ্যের মালিকানা নিয়েও। এই সঙ্ঘাতের যুক্তিগ্রাহ্য কারণও আছে। কারণ শুধু এই নয় যে, উৎপাদনের উপকরণের মালিক উৎপাদনের উপকরণ ব্যবহারকারীদের শোষণ করে বা উৎপন্ন পণ্যের ন্যায্য হিস্যা থেকে তাদের বঞ্চিত করে; এই সঙ্ঘাতের কারণ আরো গভীর। আর তা হলো, ওই সব উৎপাদনের উপকরণ অতীত শ্রমেরই পুঞ্জীভূত ফসল। সুতরাং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক অধিকার তাতে নেই- থাকার কথা নয়। এই উপকরণসমূহের এবং এদের ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন পণ্যের মালিক সব মেহনতি মানুষ একত্রে মিলেই হতে পারে- অর্থাৎ উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানাই ন্যায্য ও মানবিক বলে অনেকের মত। এ কথা কার্ল মার্কস বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। Capital is dead labour that, vampire like, only lives by sucking living labour, and lives the more, the more labour it sucks. The time during which the labour works, is the time during which the capitalist consumes the labour power he has purchased of him’ (Karl Marx, Capital, Progress Publishers, Moscow,Vol. 1, p.224.).

অর্থাৎ শ্রমিকের ঘামঝরা পুঞ্জীভূত পরিশ্রমই পুঁজি এবং শ্রমিকের ক্রমাগত ঘামঝরা পরিশ্রমের মূল্যেই তা লালিত। তা কোনো ব্যক্তির মালিকানায় যাবে কেন যেখানে সামাজিক শ্রমের ফসল পুঁজি। উৎপাদন কার্যের সংগঠক হিসেবে পুঁজিপতির ব্যক্তিগত শ্রমকে অস্বীকার করা হচ্ছে না, তবে ওই শ্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে অপরাপর শ্রমজীবীর মতো তার যা প্রাপ্য তার অতিরিক্ত যেটা সে মুনাফা হিসেবে একাই আত্মসাৎ করছে তার প্রতিবাদ করা হচ্ছে। এখানেই সঙ্ঘাত- একপক্ষে উৎপাদনের উপকরণের মালিক এবং অপরপক্ষে উৎপাদনের উপকরণের যুগপৎভাবে উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী। এটাই ‘শ্রেণী সঙ্ঘাত’ নামে অভিহিত।

মানুষ বা মজুর- কায়িক শ্রমই হোক আর মানসিক শ্রমই হোক- হিসেবে সব মানুষ একই পাটাতনে অবস্থান নিচ্ছে। কেবল উৎপাদনের উপকরণের সাথে সম্পর্কের কারণেই তারা বিভিন্ন দিক থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক দল হয়ে যাচ্ছে বঞ্চনাকারী এবং আরেক দল হয়ে যাচ্ছে বঞ্চিত। বঞ্চিত চাচ্ছে প্রাপ্য বুঝে নিতে আর বঞ্চনাকারী চাচ্ছে তা নানা কৌশলে রোধ করতে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, বঞ্চিতরা বঞ্চনাকারীদের হাতে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। বঞ্চনাকারী বঞ্চিতের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না। এখানে মানবতাবোধ অপমানিত ও অস্বীকৃত হচ্ছে। এই মানবতাবোধকে উজ্জীবিত করার জন্যই শিক্ষা। কোনো ব্যক্তির মানবতাবোধের যে অপমৃত্যু ঘটেছে তাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই শিক্ষা এবং বঞ্চিতের জন্য শিক্ষার মাধ্যমে এই উপলব্ধি জাগিয়ে তোলা উচিত যে, মানুষ মনুষ্যত্ব অর্জন করে মানবতাবোধসম্পন্ন পুরোপুরি মানুষে উন্নীত হতে হবে।

এই জাগ্রত মানবতাবোধ কোনো দয়া নয়, ত্যাগ নয়- বরং মানুষ হিসেবে এমন একটি সহজাত গুণ যা কেবল শিক্ষার মাধ্যমেই বিকশিত হতে পারে। এই মানবতাবোধ সর্ব প্রকার জড়ের সাথে সম্পর্কমুক্ত হয়ে মানুষে মানুষে সহজ সম্পর্কের ভেতর দিয়েই মানুষ অর্জন করতে পারে, অন্য কোনোভাবে নয়। প্রত্যেকটি মানুষকে যাবতীয় শৃঙ্খলমুক্ত করেই এই লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। এটিই হচ্ছে মানুষকে মানবিকতা গুণে গুণান্বিত করে তোলার শিক্ষার ভিত্তি। মানুষের শৃঙ্খলমুক্তি কেবল উৎপাদনের উপকরণ তথা যাবতীয় জড় থেকে হলেই হবে না; এই জড়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যেসব বিশ্বাস ও আচরণের জন্ম হয়েছে তা থেকেও মুক্ত হওয়া প্রয়োজন। বস্তুত শুধু সম্পত্তির সাথেই নয়, সম্পত্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত বিশ্বাস ও আচরণ হতে মানুষকে মুক্ত না করে মানবতায় সিক্ত জীবনের স্বাদ মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এ কারণেই ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে শিক্ষার আসল লক্ষ্যই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। নিজ দেশে সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি, শ্রমজীবী মানুষের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন এবং পরদেশ লুণ্ঠনের শিক্ষার প্রসার সেখানে বেড়েই চলেছে।

এখানে ‘হিউম্যানিজম’ ও মানবতাবোধের প্রশ্নটি এসে যায়। মানবতাবোধ বলতে যা বুঝায়, ইংরেজি ‘হিউম্যানিজমে’ ঠিক তা নেই। হিউম্যানিজম সম্বন্ধে বলতে গিয়ে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী আলফ্রেড ভন মার্টিন বলেন : ‘Humanism here represented as an ideology which played a closed defined part in the bourgeoisie’s struggle for emancipation and power. The concept humanist knowledge concerned with truths applied to humanity in general, with an ethical system based upon personal virtues (i.e. the ability gained by an individual’s own endeavour) implies the negation of all privileges based upon birth and estate; (বিনয় ঘোষ, বাংলার বিদ্বৎসমাজ, প্রকাশ ভবন, কলকাতা ১৯৮৭, পৃষ্ঠা-১১. উদ্ধৃত)।

সমাজবিজ্ঞানী বিনয় ঘোষ বলেন, ‘হিউম্যানিস্ট জ্ঞান সেই সত্যের জ্ঞান, যা সমগ্র মানবসমাজে প্রযোজ্য। হিউম্যানিজম জন্মগত জমিদারিগত কোনো সামাজিক অধিকার ও ক্ষমতায় বিশ্বাস করে না।… জমিদারি স্বোপার্জিত সম্পত্তি নয়, সম্রাটের স্বার্থে উপহার দেয়া সম্পত্তি, লুটতরাজ করা সম্পত্তি। জমিদারির আয় প্রধানত ‘Unearned income’, ব্যক্তিগত কায়িক বা মানসিক মেহনতের আয় নয়।… জমিদারের মর্যাদা জমিদারির জন্য, ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য নয়। ক্যাপিটালিস্ট তা নয়। ক্যাপিটালিস্ট Surplus value মুনাফারূপে আত্মসাৎ করে যতই ধনিক হোন না কেন, এনট্রাপ্রেনর হিসেবে তার ব্যক্তিগত বুদ্ধি, সাহস, মেহনত সব কিছুর মূল্য আছে, অন্তত ধনতন্ত্রের অভ্যুদয় পর্বে।…. নবযুগে ‘হিউম্যানিজম’ এই বংশগত ও বৃত্তিগত অধিকার অস্বীকার করে, সর্বক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব ও ক্ষমতাকে অন্তত স্বীকৃতি দিলো। হিউম্যানিজমের মূলমন্ত্র হলো ব্যক্তিমর্যাদা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ (ঐ, পৃষ্ঠা : ১১-১২)। সামন্তবাদের তুলনায় পুঁজিবাদ অগ্রসর, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পুঁজিবাদে ‘মানবতা’ নামক বিষয়টি অনুপস্থিত। পুঁজিবাদের পরবর্তী ধাপে এর উপস্থিতি যেমন দেখা যায়, তেমনি সেখানে এর বিকাশের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। পুঁজিবাদে ব্যক্তিগত পুঁজির ওপর মালিকানা বজায় রেখেও একজন ‘হিউম্যানিস্ট’ হতে পারে কিন্তু মানবতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন মানবতাবাদীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। Surplus value-টা মজুরের শ্রমের উদ্বৃত্ত ফসল যা ক্যাপিটালিস্ট একাই হরণ করে। এনট্রাপ্রেনর হিসেবে ক্যাপিটালিস্টের যে সাহস ও মেহনত তার উৎস মেহনতি মানুষ এবং সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত যে পণ্য-বাজার তা-ই। এর থেকেই উৎপন্ন হয় Surplus value. সুতরাং তা সমষ্টিগতভাবে জনগণেরই প্রাপ্য। তাই বলা যায় যে, শ্রমজীবী জনগণ এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করেই ক্যাপিটালিস্ট লালিত হচ্ছে। এখানেই মানবতা খর্ব হচ্ছে। তাই পুঁজিবাদের ‘হিউম্যানিজম’ আওতায় পড়লেও মানবতার আওতায় পড়ে না। আর তাই ক্যাপিটালিস্ট সমাজব্যবস্থা এবং মানবতাবাদী সমাজব্যবস্থায় শিক্ষার মূল লক্ষ্য আলাদা হয়ে পড়ে। মানবতাবাদ ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ এক কথা নয়।

ইসলামী ব্যবস্থায় সম্পদের ব্যবহারের বিষয়টি শোষণমুক্ত মানবতাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন সরকারি মালিকানা ছাড়া ব্যক্তিবিশেষ যদি বেশির ভাগ আবাদি ভূমি হস্তগত করে বসে এবং গরিব কৃষকের যদি ভূমির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাহলে রাষ্ট্র লা-ওয়ারিশ, পতিত ও অনাবাদি কৃষিভূমি কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বণ্টন করে দেবে। ভূমির মালিকদের কাছে কৃষিকার্যের অপ্রয়োজনীয় ভূমি থাকলে এসব ভূমি তাদের দখলমুক্ত করে কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে। এহেন শিক্ষা মানবিক এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, মহিলা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা