পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মেজর (অব) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার ঘটনার ‘রহস্যজট’ খুলতে শুরু করেছে। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও স্থানীয়দের বয়ানে ঘটনার পরম্পরায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তদন্তে প্রতিবেদনে জমা দিলে পুরো হত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ঘটনার ঠিক এক মাস পর এসে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পুলিশের তিন সোর্সকে দিয়েই মেজর সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডাকাত নাটক সাজানোর নির্দেশ এসেছিল সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসের কাছ থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী তার স্থানীয় সোর্সদের মাধ্যমে পাহাড় থেকে ডাকাত নেমে আসার ‘নাটক সাজান’। এরই অংশ হিসেবে মসজিদে মাইকিংসহ স্থানীয়দের ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে পুলিশের তিন সোর্স। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। কক্সবাজারের টেকনাফের মারিশবুনিয়া পাহাড়ের আশপাশের গ্রামের স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন এই ‘ডাকাত নাটক’-এর গল্প।

এদিকে সেনাবাহিনীর আর কাউকে যেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের ভাগ্যবরণ করতে না হয়, সে জন্য তার হত্যাকা-ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করেছেন বাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারা ক্রিমিনাল তাদের উপযুক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা সেনাবাহিনীর সার্ভিং

অথবা রিটায়ার্ড কারও সঙ্গে না ঘটে। আমি সেটা প্রত্যাশা করি।’ তিনি বলেন, ‘যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা সবাই জানে। অত্যন্ত জঘন্যতম একটা ঘটনা ঘটেছে এবং সেটার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। এটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে এবং সাজাটা যখন হবে তা হলে সন্তুষ্টির প্রশ্ন আসবে। তার আগে সন্তুষ্টি কীভাবে বলব, বলার সুযোগ নেই।’

সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের ‘অস্বাভাবিক’ কিছু ঘটলে নিজস্ব তদন্ত হয় জানিয়ে জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘সেটা আমাদের ডিপার্টমেন্টাল প্রয়োজন। আমরাও সে ধরনের একটা তদন্তের নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছিলাম, তদন্ত হচ্ছে।’

৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের চেকপোস্টে কী ঘটেছিল তা বেরিয়ে আসছে। পুলিশের পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। কক্সবাজারের আদালতে গতকাল সোমবার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন নন্দদুলাল; আগের দিন দিয়েছিলেন লিয়াকত। সিনহা হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি লিয়াকত আলী। এ পর্যন্ত এ মামলায় ৮ জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে দুই নম্বর আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এখনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, লিয়াকত স্বীকার করেছেন- তার গুলিতেই সিনহা মারা যান। যখন গুলি করা হয় তখন সিনহার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। সিনহা অস্ত্র তাকও করেননি। অভিযুক্ত এপিবিএন সদস্যরা স্বীকারোক্তিমূল জবানবন্দিতে জানান, সিনহা গাড়িতে পিস্তল রেখে হাত উঁচু করে বের হন। এ সময় তিনি লিয়াকতকে শান্ত হতে বলেন।

বিষয়টি স্পর্শকতার হওয়ায় কেউ এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। তবে ঘটনার বর্ণনা দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মনে হচ্ছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-।’ অভিযুক্ত এপিবিএন সদস্যরাও বলেছেন, সিনহার গাড়ি চেকপোস্টে আসার আগে থেকে সেখানে অবস্থান করছিলেন লিয়াকত। এ সময় তাকে খুবই উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। মনে হয়েছিল, তিনি যেন কারও অপেক্ষায় চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন। গুলি করার সময় তাকে খুবই হিংস্র দেখাচ্ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাসিন্দা ও সাক্ষীদের বয়ানে একটি বিষয় স্পষ্ট, পাহাড়ে সিনহার টিম কেন এসেছিল তা জানা ছিল লিয়াকত ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের। ঘটনার কয়েক দিন আগে স্থানীয়দের কাছে লিয়াকত এবং ওসি খোঁজ নিয়েছিলেন তাদের। তারা পাহাড়ে কী করছেন তা সোর্স ও স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, পুরো ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ এবং সোর্সদের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ঘটনার দিন সিনহা পাহাড় থেকে নামার পর ডাকাত সন্দেহে পুলিশের কাছে যে খবর দেওয়া হয়েছিল, তা পরিকল্পিত। প্রদীপের সোর্সরা ওই সময় পাহাড়ে ছিল। তারাই ডাকাতির বিষয়টি মসজিদে ও স্থানীয়দের বলে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছেন।

তিন আসামির জবানবন্দি

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আরও তিন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গতকাল বিকাল ৩টার দিকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সকাল সাড়ে ১০ থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এই তিন সাক্ষী জ্যেষ্ঠ বিচারক তামান্না ফারাহর খাস কামরায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আসা তিন আসামি হলেন, টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও মো. আয়াছ। অবশ্য তারা তিনজন পুলিশের করা একটি মামলার সাক্ষী ছিলেন। এলাকায় তারা পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। পরে মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব তাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়ে গ্রেপ্তার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও র‌্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার ১২ টার দিকে এ ৩ জনকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ্র আদালতে হাজির করে ৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত দ্বিতীয় দফা ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। কিন্তু এই তিন দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনেই সিনহা হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্বীকার করেন। এ জন্য তাদের বুধবার সাড়ে ১০টার দিকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। আশা করি আমাদের কাছে দেওয়া সব তথ্য আদালতের কাছে স্বীকার করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে স্বীকারোক্তি শেষে এ তিনজনকে বিকালে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন দেবে তদন্ত কমিটি

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার আসামি বরখাস্ত হওয়া সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার ফটকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত দল। বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলে জিজ্ঞাসাবাদ।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তদন্ত কমিটির প্রধান। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ সময় ধরে ওসি প্রদীপের সঙ্গে কথা বলেছি। তার দেওয়া তথ্য এবং আগে প্রাপ্ত তথ্যগুলো আমরা বিশ্লেষণ করছি। আশা করছি, সরকারের দেওয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন দিতে পারব।

এর আগে ওসি প্রদীপকে সিনহা হত্যার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব বিভিন্ন সময় ধারাবাহিকভাবে ১৫ দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের কারণে ওসি প্রদীপের সাক্ষাৎ পাননি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত এই তদন্ত কমিটি। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বারবার সময় পিছিয়েছে। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট তৃতীয়বারের মতো সময়ের আবেদন করেন তদন্ত কমিটি।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার।

একইভাবে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ জনকে আসামি করে সিনহার বোন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ওসি প্রদীপসহ সাত আসামি।