রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। শয্যা ছাপিয়ে ওয়ার্ডের ভেতর, বারান্দা, করিডোর থেকে শুরু করে সিঁড়ি পর্যন্ত রোগীরা দীর্ঘ লাইন দিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। মেঝেতে অতিরিক্ত শয্যা দিয়েও রোগীর ভিড় সামলাতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শয্যা বিছিয়ে শুয়ে আছেন, এরপরও রোগীর চাপ কমছে না।

এর ভেতর চিকিৎসা নিতে আসা কয়েক হাজার রোগী তেলাপোকার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরছে বিড়াল। বসে-শুয়ে কোনোভাবেই শান্তি পাচ্ছে না রোগীরা। শুয়ে থাকলে গায়ের ওপর দিয়ে তেলাপোকা চলাফেরা করছে। খাবার এনে রাখলে তার ভেতর ঢুকে পড়ছে। এটা দেখে খাবার খেতে পারছে না রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ২, ৫, ৬ ও ৭ নং ওয়ার্ড তেলাপোকায় সয়লাব। এগুলো খাবারের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছে। দেয়ালের টাইলস খুলে পড়ছে। এর ভেতরে বাসা বেঁধেছে তেলাপোকা। করোনারি কেয়ার ইউনিটেও (সিসিইউ) তেলাপোকা। অক্সিজেনের পাইপের গোড়ায় ও ইলেকট্রিক ছকেটের ভেতরেও বাসা বেঁধেছে। বিড়াল অবাধে ঘোরাফেরা করছে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। সব ওয়ার্ডের ভেতরেই তেলাপোকা। কোথাও কম আর কোথাও বেশি। তেলাপোকার যন্ত্রণায় রোগীরা শান্তিতে বেডে থাকতে পারে না। ঘুমের মধ্যে শরীরের ভেতরে তেলাপোকা ঢুকে পড়ায় হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে।

বুকে ব্যথা নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে হৃদরোগ হাসপাতালে ভর্তি হন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের গোয়ালগ্রামের সুনীল মণ্ডল (৬০)। এরপর তিনি হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বি-৪১ নং বেডে ওঠেন।

সুনিল মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে চিকিৎসা ভালো, কিন্তু পরিবেশের কথা আর কী বলব, তেলাপোকা আর তেলাপোকা! এগুলোর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ আমরা। এখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে! শুয়ে থাকলে কানের মধ্যে তেলাপোকা ঢুকে যায়। খাবার রাখলে তা আর পরে খাওয়া যায় না। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। এভাবেই যন্ত্রণা সহ্য করে চিকিৎসা নিচ্ছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি ব্যবস্থা নেয় তাহলে তেলাপোকা থাকে না।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট থানার চরধরমপুর গ্রাম থেকে হৃদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত ২৯ আগস্ট বুকে ব্যথা অনুভব করি। আগে থেকেই কিছুটা সমস্যা ছিল। ওই দিন আমি এখানে ভর্তি হই। ভর্তির পর বেড পাইনি, মেঝেতেই ছিলাম। এর দুদিন পর বি-৪২ বেড পেলাম। আমার মাথার কাছে তেলাপোকা গিজ গিজ করছে। মনে হলো আমাকে কেউ ইচ্ছা করে শাস্তিস্বরূপ তেলাপোকার সাথে রেখে গেছে। খুবই অবাক লাগে! এটা দূর করা তো তেমন কঠিন কোনো কাজ নয়।’

ময়মনসিংহের তারাকান্দা থানার বালী গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আজিজুল হক (৪৫) বলেন, ‘বুকে ব্যথা অনুভব করছি বেশ কয়েক দিন ধরে। আসবো আসবো করে আসা হয় না। পরে গত ৩ সেপ্টেম্বর এই হাসপাতালে এসে ভর্তি হই। কিন্তু বেড পেলাম না। একদিন মেঝেতে থাকলাম। এরপর ম্যানেজ করে বি-৪০ বেড পেলাম। এসে উঠলাম বেডে। তারপর শুরু হলো তেলাপোকার সাথে যুদ্ধ। নাকে-কানে শরীরের সব জায়গায় তেলাপোকা। খাবার এনে এক মিনিটও রাখার উপায় নেই, সঙ্গে সঙ্গে তেলাপোকা হাজির।’

তিনি আরও বলেন, ‘উন্নয়নকাজে সরকার এত টাকা ব্যয় করছে, সেখানে তেলাপোকা মারার ওষুধ কেনার টাকা নেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের! আমরা চিকিৎসা নিতে আসি আবার চলে যাই, কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান হয় না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী জানান, হাসপাতালে কত কিছু নয়-ছয় হয় দেখি, কিন্তু ছোট চাকরি করি বলে কিছু বলতে পারি না। বেডগুলোর অবস্থা দেখেন, কী খারাপ অবস্থা! তেলাপোকার গোডাউন। বিড়াল হাঁটে সব সময়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চাইলে একদিনেই সমস্যা দূর করা সম্ভব।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এখানে সব ওয়ার্ড মিলিয়ে ৪২৪টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে করোনার জন্য নিচের ওয়ার্ড ছেড়ে দিতে হয়েছে। হাসপাতালে বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি, তারপরও আমরা চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। এখন আমাদের ৭০০ রোগী আছে। তাদের প্রত্যেকের সাথে দুজন করে থাকলেও ১ হাজার ৪০০ জন স্বজন রয়েছে। করোনার কারণে কাজ এগোতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, সঙ্কট সমাধানে আগামী দুই মাসের মধ্যে আমাদের ভবনের কাজ শেষ হলে ১ হাজার ২০০ রোগী রাখা যাবে। তেলাপোকার উপদ্রবের বিষয়টি জানানোর জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান। এ সময় ওয়ার্ডমাস্টারকে ডেকে আনেন এবং দ্রুত তেলাপোকার বংশ ধ্বংস ও বিড়াল যাতে ওয়ার্ডে থাকতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেন।