কক্সবাজার: ভারী বর্ষণে আবারও প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের ১৮টি গ্রাম। জোয়ারের পানির আঘাতে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধটি।

রোববার ভোররাত থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত উপজেলায় ভারী বর্ষণ হয়। এতে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের ১৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এসব গ্রামের ১ হাজার ৬০০ পরিবার পানিবন্দী। এ তথ্য প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী ও বাহারছড়া ইউপির চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিন।

দুই ইউপি চেয়ারম্যান জানান, দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম ডুবে গেছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর প্রবল জোয়ারে উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে শনিবার তেমন কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া লোকজন বাড়িও ফিরছিলেন। তবে রোববার নতুন করে বৃষ্টিপাতে আবারও পাহাড়ি ঢল নামে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার।

প্লাবিত ১৮টি গ্রাম হলো হ্নীলার ওয়াব্রাং, চৌধুরীপাড়া, জালিয়াপাড়া, সিকদারপাড়া, উলুচামারি, রঙ্গিখালী, লামারপাড়া, কোনাপাড়া এবং বাহারছড়ার শামলাপুর, শিলখালী, চৌকিদারপাড়া, বাইন্না পাড়া, কাদের পাড়া, হলবনিয়া, জাহাজপুরা, হাজাম পাড়া, মারিশবনিয়া, মাথাভাঙ্গা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালীর কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরপানি। টেকনাফ-কক্সবাজার আঞ্চলিক সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকার রাস্তাঘাট, বসতঘর, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও মসজিদ হাঁটু ও কোমরপানিতে ডুবে আছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে শিশু-নারী-পুরুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে দেখা গেছে। এই দুটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে পানিতে ডুবে গেছে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

হ্নীলার লামারপাড়ার গৃহবধূ আমিনা বেগম বলেন, ‘ঘরের ভেতরে কোমরপানি। তাই ছেলে মেয়েদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছি। এ সময় বাড়িতে কেউ না থাকলে চুরির ঘটনা ঘটে। বাড়ি পাহারা দিতে স্বামী ঝুঁকি নিয়ে সেখানে রয়েছেন। এভাবে কি মানুষের জীবন চলে? আমরা কোনো ত্রাণসামগ্রী চাই না। পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনে সরকারের পদক্ষেপ চাই।’

লামাপাড়ার বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘হঠাৎ এভাবে ভারী বর্ষণ হবে কল্পনাও করিনি। এ বছর বর্ষার শুরুতেই এ এলাকায় পানি ওঠেনি। বর্ষার শেষ দিকে এসে আচমকা অবিরাম বর্ষণের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বসতঘরে ঘুমানোর সুযোগ নেই। এলাকার খাল খনন খুবই জরুরি।’

বাহারছড়ার স্থানীয় বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ করে এলাকা বসতঘর ও রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। ওই সময় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বর্তমানে পানিবন্দী হয়ে পড়ছেন ১০টি গ্রামের মানুষ। এসব মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

হ্নীলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী বলেন, পর্যাপ্ত স্লুইসগেট (জলকপাট) না থাকায় বারবার এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি খাল খনন করা হলে এসব দুর্ভোগ থেকে স্থানীয় লোকজন পরিত্রাণ পাবে।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন বলেন, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে টেকনাফে পাহাড় ধসে এক পরিবারের পাঁচ শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছিলেন। প্লাবিত হয়েছিল একটি পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম। ইউএনও আরও বলেন, আবারও নতুন করে পাহাড়ি ঢলে দুটি ইউনিয়নের ১৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই সব গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধের বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শাহপরীর দ্বীপ এলাকার প্রবীণ শিক্ষক জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণাধীন নাফ নদীর সীমান্ত সড়ক ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে নির্মাণাধীন ১২১ কোটি টাকার বেড়িবাঁধের স্থাপন করা ব্লকগুলো ধসে পড়ছে। ২০২০ সালের ৩০ জুন এই বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে তা হয়নি। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা করা না হলে বাঁধটি ভেঙে আবারও ৪০ হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হবে।

প্রবাল/মইম