গৌরব ও ঐতিহ্যের ৭০ বছরে পদার্পণ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পদ্মা তীরের কুঠিবাড়ি থেকে  হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি বিনির্মাণে আজ দেশের খ্যাতনামা বিদ্যাপীঠ এই বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু গুণে-মানে-সম্মানে এই খ্যাতি অর্জন করতে বহু চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেছে ৭৫৩ একরের বিদ্যাপীঠ। কালের প্রবাহে এ ক্যাম্পাস হয়েছে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের সাক্ষী।

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মূর্তপ্রতীক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাষা আন্দোলনের কিছুসময় আগে থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট এক কমিটি গঠিত হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শহরের ভুবন মোহন পার্কে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গনে সমবেত হোন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাসের দাবি তোলেন। রাজপথে চলে আন্দোলন।

সে-সময় আন্দোলন করতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন ১৫ ছাত্রনেতা। ফলে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।

একের পর এক আন্দালনের চাপে টনক নড়ে দেশের সুধী মহল ও সরকারের। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। সেই বছরের ৬ জুলাই অধ্যাপক ইতরাত হোসেন জুবেরীকে উপাচার্য করে বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিদ্যাচর্চার খ্যাতিতে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে রূপ নেয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাদান, বিদ্যাচর্চা, গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের সুখ্যাতি দেশর গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে।

৫ জন ছাত্রীসহ মোট ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৮ হাজার ৩’শ। যাদের মধ্যে ৩১ জন বিদেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি অনুষদের ৫৯টি বিভাগে পাঠদান চলছে। এছাড়াও রয়েছে দটি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট, ১৩টি একাডেমিক ভবন। ১৭টি আবাসিক হলের মধ্যে ১১টি ছাত্র ও ৬টি ছাত্রীদের এবং গবেষক ও বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ডরমিটরি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা ১১৮৭জন, কর্মকর্তা রয়েছেন ৮১৬ জন, সাধারণ কর্মচারী ৯৬৬ জন ও সহায়ক কর্মচারী ৫৪৮ জন।

প্রতিষ্ঠার গত ৬৯ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২,৬৫০ জন শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১,৯৪৬ জনকে পিএইচডি এবং ৭০৪ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণায় অভাবনীয় সাক্ষর রেখে আসছে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে বিশ্ব দরবারে সমুন্নত করেছে।

সম্প্রতি গবেষণা করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার করে সাড়া ফেলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক অধ্যাপক মনজুর হোসেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের উদ্ভাবিত মৎসজাত ৯ ধরণের খাবার, উন্নতজাতের মাছ উৎপাদন, কৃষি ক্ষেত্রে উন্নতজাতের কলা ও ধান উৎপাদন দেশে বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছে। পদার্থ বিজ্ঞানে ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুন কুমার বসাক, সালেহ আহমেদ নকীবসহ বিভিন্ন গবেষকের নানা অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক সাব্বির সাত্তারের শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনিক দক্ষতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

দেশের অন্যতম সেরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে অত্যাধুনিক রূপ দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলমান রয়েছে ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা। যারমধ্যে রয়েছে সাত পুকুর গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা জালিয়াতি রোধে প্ল্যাগারিজম প্রকল্প, বিশ্ববিদ্যালয় আরকাইভস ও অনলাইনে তথ্য জমা রাখার জন্য ‘আরইউ ক্লাউড’, ব্র্যান্ডিং গিফট শপ, বিশ্ববিদ্যায়ের নিউজলেটার ‘বিদ্যাবার্তা’, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যচিত্র, সৌন্দর্য্য বর্ধণ, ওয়েবসাইট আধুনিকীকরণ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের নামকরণ। এছাড়া এ প্রকল্পের মধ্যে থাকা ২০ তলার একাডেমিক ভবন, ছেলেদের ও মেয়েদের পৃথক ১০ তলা আবাসিক হল নির্মান চলমান।